মোদির ইজরায়েল সফর ও চাবাহার ইস্যু: পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের কূটনৈতিক ‘ব্যালান্সিং অ্যাক্ট’


২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। একদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইজরায়েল সফরে গিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে ইরান প্রকাশ্যে ভারতের ওপর অসন্তোষ জানাচ্ছে চাবাহার বন্দর প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ শূন্য করার কারণে। একই সময়ে এই দুই ঘটনা ঘটায় বিষয়টি আর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সীমায় নেই — এটি এখন স্পষ্টভাবে একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ সালে মোদির ইজরায়েল সফর

মোদির ইজরায়েল সফর (২৫–২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

২০২৬ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মোদি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী -এর আমন্ত্রণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যান। এটি তাঁর দ্বিতীয় ইজরায়েল সফর। ২০১৭ সালে তিনি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইজরায়েল সফর করেছিলেন — যা ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই সফরের সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনা ছিল মোদির ইজরায়েলি পার্লামেন্ট Knesset-এ ভাষণ দেওয়া। তিনি প্রথম ভারতীয় নেতা যিনি সেখানে বক্তব্য রাখেন এবং বক্তব্য শেষে স্ট্যান্ডিং ওভেশন পান। তাঁর বক্তব্যে “friendship, respect and partnership” — বন্ধুত্ব, সম্মান ও অংশীদারিত্ব — এই তিনটি শব্দকে তিনি ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

সফরের মূল আলোচ্য বিষয়

এই সফর কেবল আনুষ্ঠানিক ছিল না; বরং অত্যন্ত বাস্তবভিত্তিক কৌশলগত আলোচনায় ভরা ছিল। আলোচনার প্রধান ক্ষেত্রগুলো ছিল—

  • প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
  • সন্ত্রাসবাদ দমন
  • উন্নত প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ সহযোগিতা
  • কৃষি ও জল ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
  • বাণিজ্য ও বিনিয়োগ
  • আঞ্চলিক নিরাপত্তা

বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ইতিমধ্যেই ইজরায়েলের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা ক্রেতা। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার সিকিউরিটি এবং নজরদারি প্রযুক্তিতে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা রয়েছে। আলোচনায় ভারতের স্বদেশী এয়ার ডিফেন্স প্রকল্প “সুদর্শন চক্র”-এর মতো উদ্যোগেও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ সফরের সময় পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বেড়ে চলেছে — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, ইরান-আমেরিকা উত্তেজনা, এবং গাজা-সংক্রান্ত আঞ্চলিক পরিস্থিতি এই সফরের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।


চাবাহার বন্দর: ভারতের ‘গোল্ডেন গেট’ কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইরানের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ভারতের কাছে শুধু একটি বন্দর নয় — এটি একটি ভূরাজনৈতিক প্রবেশদ্বার।

ভারত বহু বছর ধরে পাকিস্তানকে বাইপাস করে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর জন্য বিকল্প স্থলপথ খুঁজছিল। পাকিস্তান ভারতকে তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে আফগানিস্তানে পণ্য পাঠানোর অনুমতি দেয় না। ফলে ভারতের জন্য চাবাহার প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কেন চাবাহার এত গুরুত্বপূর্ণ?

চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে ভারতের জন্য তৈরি হয় একটি নতুন বাণিজ্য করিডর:

ভারত → ইরান → আফগানিস্তান → মধ্য এশিয়া → ককেশাস → ইউরোপ

এটি আসলে আন্তর্জাতিক নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই করিডর ভারতের জন্য তিনটি বড় সুবিধা দেয়—

  1. পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে স্থলপথে যোগাযোগ
  2. আফগানিস্তানে মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বজায় রাখা
  3. মধ্য এশিয়ার জ্বালানি সম্পদে প্রবেশ

এই কারণেই অতীতে মোদি নিজেই চাবাহারকে “golden gateway” বলেছিলেন।


বাজেটে শূন্য বরাদ্দ: কী ঘটল?

২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের ভারতের বাজেটে প্রথমবার চাবাহার প্রকল্পে শূন্য টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

বরাদ্দের পরিবর্তনের ধারা

  • FY 2024–25 বাজেট অনুমান: ₹১০০ কোটি
  • FY 2024–25 সংশোধিত অনুমান: ₹৪০০ কোটি
  • FY 2025–26 (২০২৬ বাজেট): ₹০

অর্থাৎ খুব অল্প সময়ে প্রকল্পটি তহবিল বৃদ্ধির পর্যায় থেকে সরাসরি স্থগিত অবস্থায় চলে গেছে।


মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: আসল কারণ

চাবাহার সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু আসলে ইরান নয় — বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যদিও ভারতের জন্য চাবাহার প্রকল্পে ৬ মাসের বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছিল, যার মেয়াদ শেষ হবে ২৬ এপ্রিল ২০২৬।

নিষেধাজ্ঞার মূল ঝুঁকি:

  • ভারতীয় কোম্পানি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে
  • ডলার লেনদেন বন্ধ হয়ে যেতে পারে
  • পশ্চিমা বাজারে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে

অতএব ভারত একটি কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে পড়ে —
ইরানের সাথে কৌশলগত প্রকল্প চালাবে, নাকি পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবে?


ইরানের প্রতিক্রিয়া

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের সিদ্ধান্তে প্রকাশ্যে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চাবাহার শুধু ইরানের নয়, ভারতেরও প্রকল্প — এবং এটি ভারত মহাসাগরকে মধ্য এশিয়ার সাথে যুক্ত করার একটি “golden gateway”।

তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মোদির পুরনো ব্যবহৃত শব্দ ব্যবহার করে কূটনৈতিক বার্তা দেন — অর্থাৎ এটি ছিল সরাসরি রাজনৈতিক ইঙ্গিত।

তবে ভারতের প্রতি সম্পূর্ণ বিরূপ অবস্থান নেয়নি তেহরান। ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত অপেক্ষাকৃত নরম সুরে বলেন, তারা ভারতের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝে এবং আলোচনা চলছে।


ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

ভারতের বিরোধী রাজনীতিতেও এই সিদ্ধান্ত বিতর্ক তৈরি করেছে। কংগ্রেস সাংসদ প্রশ্ন তুলেছেন — এটি কি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, নাকি বাইরের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ?

তিনি উল্লেখ করেন:

  • এক বছরে ₹১০০ কোটি → ₹৪০০ কোটি → ₹০
  • এটি একটি তীব্র নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত

তার মতে, বাজেটে শূন্য বরাদ্দ একটি ভুল সংকেত পাঠায় যে ভারত সম্ভবত প্রকল্পটি ছেড়ে দিচ্ছে।


বৃহত্তর কৌশলগত দ্বন্দ্ব

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এখন একাধিক শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে।

ভারতের সামনে তিনটি সমান্তরাল সম্পর্ক:

  1. যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা জোট
  2. ইজরায়েল (প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা)
  3. ইরান (ভূরাজনৈতিক সংযোগ ও জ্বালানি)

চাবাহার এই তিন সম্পর্কের সংঘর্ষস্থল হয়ে উঠেছে।

কৌশলবিদরা মনে করেন ভারত সম্পূর্ণভাবে প্রকল্প থেকে সরে আসেনি; বরং এপ্রিল ২৬ নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা পর্যন্ত “tactical freeze” করেছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি স্থায়ী নয় — এটি একটি সময় কেনার কূটনীতি।


চীন ফ্যাক্টর: কেন ঝুঁকি বড়

যদি ভারত চাবাহার থেকে পিছিয়ে যায়, সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় লাভবান হতে পারে চীন।

চীন ইতিমধ্যে পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দরে বিনিয়োগ করেছে (CPEC প্রকল্প)। চাবাহার গওয়াদরের কাছেই অবস্থিত। ফলে ভারত সরে গেলে:

  • ইরান বিকল্প বিনিয়োগকারী খুঁজবে
  • চীন সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে
  • মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রবেশ সীমিত হয়ে যাবে

এতে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে।


ইজরায়েল-ইরান ভারসাম্য: ভারতের কূটনৈতিক দড়ির উপর হাঁটা

মোদির জেরুজালেম সফর এবং একই সময়ে ইরানের হতাশা — এই দুই ঘটনা ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির প্রকৃত চরিত্রকে স্পষ্ট করে।

ভারত এখন একটি multi-alignment strategy অনুসরণ করছে। অর্থাৎ:

  • আমেরিকার সাথে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা
  • ইজরায়েলের সাথে নিরাপত্তা ও উদ্ভাবন
  • ইরানের সাথে ভূরাজনৈতিক সংযোগ
  • রাশিয়ার সাথে জ্বালানি

কিন্তু সমস্যা হলো পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েল ও ইরান পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে একপক্ষের সাথে সম্পর্ক বাড়ালে অন্যপক্ষ সন্দিহান হয়ে পড়ে।


ভবিষ্যৎ কী?

২৬ এপ্রিল ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ। ওই দিন মার্কিন ছাড়ের মেয়াদ শেষ হবে। এরপর তিনটি সম্ভাবনা:

  1. যুক্তরাষ্ট্র নতুন ছাড় দেবে → ভারত প্রকল্প পুনরায় শুরু করবে
  2. ছাড় দেবে না → প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি স্থগিত
  3. বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা (রুপি-রিয়াল, নন-ডলার) তৈরি

বর্তমানে ভারতের কৌশল সম্ভবত অপেক্ষা ও আলোচনা — অর্থাৎ “neither abandon nor escalate”.


উপসংহার

মোদির ইজরায়েল সফর ও চাবাহার ইস্যু আসলে একই কূটনৈতিক গল্পের দুই অধ্যায়। একদিকে ভারত উন্নত প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার জন্য পশ্চিমা ব্লকের দিকে এগোচ্ছে, অন্যদিকে তার দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ইরান ও মধ্য এশিয়ার সাথে যুক্ত।

এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে যে আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর শীতল যুদ্ধের মতো দ্বিধাবিভক্ত নয়। বরং এটি বহু-মেরু (multipolar) — যেখানে একটি দেশের পক্ষে একসাথে একাধিক শক্তির সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।

ভারত এখন ঠিক সেই পথেই হাঁটছে —
ইজরায়েলের সাথে হাত মিলিয়ে,
ইরানের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে,
এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলে।

চাবাহার তাই শুধু একটি বন্দর নয় — এটি ভারতের ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক অবস্থানের পরীক্ষাকেন্দ্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যদি আপনার কোনও বিষয়ে ডাউট থাকে বা কোনও বিষয় suggest করতে চান তাহলে মেল করুন!

নবীনতর পূর্বতন

banglafacts 4