
১. নির্বাহী সারাংশ: “মনরো ডকট্রিন ২.০”
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারির ঘটনাবলি একবিংশ শতাব্দীর জ্বালানি ভূ-রাজনীতিতে একটি মৌলিক মোড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। মার্কিন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তার এবং তার অব্যবহিত পরেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত “কৌশলগত অংশীদারিত্ব”—যার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাত কার্যত মার্কিন ব্যবস্থাপনায় আনার কথা বলা হয়—বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুতকে কার্যত মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন করে তুলেছে।
এটি কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদ—রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা PDVSA—এর ওপর একটি জোরপূর্বক কৌশলগত অধিগ্রহণ। আন্তর্জাতিক বাজারে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা শুধু সরবরাহ বিঘ্নের কারণে নয়, বরং একটি ভয়ংকর দৃষ্টান্তের কারণে: এখন থেকে “জ্বালানি সার্বভৌমত্ব” আর নিঃশর্ত নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যের ওপর নির্ভরশীল।
এই মুহূর্তে আমরা কার্যত “মনরো ডকট্রিন”-এর একটি আধুনিক, আরও আক্রমণাত্মক সংস্করণের আবির্ভাব দেখছি—যেখানে পশ্চিম গোলার্ধে জ্বালানি ও কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২. তথাকথিত “কৌশলগত অংশীদারিত্ব”: কেন এখন?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই পদক্ষেপকে “চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে ভেনেজুয়েলার সরকার মার্কিন কোম্পানিগুলির (যেমন ConocoPhillips ও ExxonMobil) সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে এবং বিপুল পরিমাণ বন্ড ঋণ খেলাপ করেছে। কিন্তু কেবল এই যুক্তি সময় নির্বাচনের ব্যাখ্যা দেয় না।
বাস্তবে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্তত তিনটি গভীর ও কৌশলগত কারণ কাজ করছে।
ক) হেভি ক্রুড সংকট ও মার্কিন শোধনাগার বাস্তবতা
মার্কিন উপসাগরীয় উপকূলের অধিকাংশ শোধনাগার “হেভি সাওয়ার ক্রুড” প্রক্রিয়াজাত করার জন্য প্রযুক্তিগতভাবে ক্যালিব্রেটেড। ভেনেজুয়েলার তেল নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয় কানাডা বা পরোক্ষভাবে রাশিয়ান উৎস থেকে এই ধরনের তেল সংগ্রহ করতে।
ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ মানে মার্কিন শোধনাগারগুলির জন্য নিশ্চিত, সস্তা ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত কাঁচামাল। এর প্রত্যক্ষ ফলাফল হবে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমানো—যা ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ।
খ) চীন–রাশিয়া অক্ষ নিষ্ক্রিয়করণ
ভেনেজুয়েলা ছিল পশ্চিম গোলার্ধে চীন ও রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাঁটি। বেইজিং প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে, যার পরিশোধ হওয়ার কথা ছিল তেলের মাধ্যমে। মস্কো PDVSA-কে ব্যবহার করেছে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারে।
মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই ঋণগুলির “কল্যাটারাল”—অর্থাৎ বাস্তব তেল সম্পদ—কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। এটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আর্থিক ভূ-রাজনীতির এক নজিরবিহীন উদাহরণ।
গ) “এনার্জি ডমিন্যান্স” মতবাদ
এই পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র “Energy Independence” ধারণা থেকে সরে এসে “Energy Dominance” নীতিতে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন কার্যত আমেরিকা মহাদেশের তিন বৃহত্তম তেল উৎপাদকের মধ্যে দুটির (যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা) ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে গভীর প্রভাব ফেলবে।
৩. বাজারে ভূমিকম্প: “সুইট বনাম সাওয়ার” বিশৃঙ্খলা
বর্তমানে বৈশ্বিক তেলবাজার দ্বিধাবিভক্ত আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। এই অস্থিরতা বুঝতে হলে তেলের বিভিন্ন গ্রেড সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
বাজার প্রতিক্রিয়া (৩–৫ জানুয়ারি, ২০২৬)
WTI (লাইট সুইট ক্রুড):
প্রাথমিকভাবে দাম বাড়লেও দ্রুত স্থিতিশীল হচ্ছে। বাজার বুঝতে পারছে, ভেনেজুয়েলার হেভি তেলের সঙ্গে WTI মিশিয়ে মার্কিন পরিশোধিত পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
Brent (আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক):
Brent-এর দাম বেড়েছে। কারণ হিসেবে কাজ করছে অনিশ্চয়তা, সম্ভাব্য OPEC+ প্রতিক্রিয়া এবং ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোতে নাশকতার আশঙ্কা।
হেভি সাওয়ার ক্রুড:
কানাডিয়ান ও অন্যান্য বিকল্প হেভি ক্রুডের দাম পড়তে পারে। বাজার ধরে নিচ্ছে, খুব শিগগিরই মার্কিন উপসাগরে ভেনেজুয়েলার তেলের প্রবাহ বাড়বে।
“রিস্ক প্রিমিয়াম”-এর প্রত্যাবর্তন
এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সরবরাহ ঘাটতির কারণে নয়, বরং ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ট্যাঙ্কার বীমা খরচ ৪৮ ঘণ্টায় তিনগুণ বেড়েছে। আশঙ্কা রয়েছে—অসমমিত যুদ্ধ, পাইপলাইন নাশকতা বা সাইবার আক্রমণ যে কোনও সময় লক্ষ লক্ষ ব্যারেল উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে।
৪. ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: কারা ক্ষতিগ্রস্ত?
এই অভিযান কয়েকটি শক্তিকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যাদের পাল্টা প্রতিক্রিয়া বাজারে আরও অস্থিরতা আনতে পারে।
চীন
চীনের কয়েক দশকের বিনিয়োগ কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই ঋণগুলোকে “স্বৈরাচারী শাসকের ওডিয়াস ডেট” বলে স্বীকৃতি না দেয়, তবে বেইজিংয়ের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত থাকবে—যেমন মার্কিন ট্রেজারি বিক্রি বা বিরল খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ।
রাশিয়া
রাশিয়ার জন্য এটি দ্বিগুণ আঘাত। একদিকে, নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পথ বন্ধ হয়েছে; অন্যদিকে, তেলের দামে দীর্ঘমেয়াদি পতন হলে রুশ অর্থনীতি চাপে পড়বে।
OPEC+
সৌদি আরব ও OPEC+-এর জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো কোটা ব্যবস্থার বাইরে ২০–৩০ লক্ষ ব্যারেল দৈনিক নতুন সরবরাহ। এটি কার্টেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
৫. ভারতের জন্য তাৎপর্য
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকির উৎস।
সুযোগ
ONGC Videsh-এর সান ক্রিস্টোবাল প্রকল্পে আটকে থাকা বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এছাড়া, অতিরিক্ত সরবরাহ এলে “এশিয়ান প্রিমিয়াম” কমতে পারে, যা ভারতের আমদানি ব্যয় হ্রাস করবে।
ঝুঁকি
স্বল্পমেয়াদে তেলের দাম যদি ১০০ ডলারের ওপরে ওঠে, তবে রুপির ওপর চাপ পড়বে এবং কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি বাড়বে। কূটনৈতিকভাবে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
৬. উপসংহার: সম্পদ বাস্তববাদের নতুন যুগ
আমরা কার্যত মুক্ত বাজারভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থার অবসান এবং “মার্কেন্টিলিজম”-এর প্রত্যাবর্তন দেখছি। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে দিয়েছে—প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করেই কৌশলগত সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
পূর্বাভাস
স্বল্পমেয়াদ (১–৩ মাস):
চরম অস্থিরতা। ভেনেজুয়েলায় প্রতিরোধ বা নাশকতার খবরে দাম হঠাৎ বাড়া–কমা করবে।
মধ্যমেয়াদ (৬–১২ মাস):
দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ। উৎপাদন বাড়লে আমদানিকারক দেশ লাভবান হবে, উৎপাদক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন
“অদৃশ্য হাত”-এর জায়গা নিয়েছে “লোহার মুঠি”। বিশ্ব জ্বালানি বাজার এখন আর কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়—এটি সরাসরি সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তির প্রতিফলন।