২০২৬ সালে গায়ানা সরকার ভারতীয় তেল ও জ্বালানি সংস্থাগুলিকে তেল অনুসন্ধান ব্লকে দরপত্রে অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এই উদ্যোগ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নীতিতে একটি যুগান্তকারী মোড় নির্দেশ করে। বর্তমানে ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেল চাহিদার প্রায় ৮৯ শতাংশ আমদানি করে, যার মধ্যে প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে। কিন্তু পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ক্রমবর্ধমান চাপ রাশিয়া-নির্ভরতা ক্রমশ কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত করছে।
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দেশ গায়ানা ভারতের সামনে একটি “স্যানকশন-কমপ্লায়েন্ট”, কম খরচের এবং দ্রুত সম্প্রসারণশীল তেল সরবরাহ উৎস হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের শেষদিকে যেখানে গায়ানার তেল উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় ৮ লক্ষ ব্যারেল, সেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১৭ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে গায়ানা বিশ্বের শীর্ষ ২০ তেল উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় প্রবেশ করবে।
ভারতের জন্য এটি শুধু একটি নতুন তেল উৎস নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং বৈদেশিক নীতির কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার একটি বাস্তব সুযোগ।
গায়ানার তেল বিপ্লব: শূন্য থেকে বৈশ্বিক শক্তি
২০১৫ সালে ExxonMobil গায়ানার স্ট্যাব্রোক ব্লকে বিশাল তেল ভাণ্ডার আবিষ্কার করার আগে দেশটির কোনো বাণিজ্যিক তেল উৎপাদনই ছিল না। ২০১৯ সালে প্রথম উৎপাদন শুরু হওয়ার পর মাত্র ছয় বছরের মধ্যে গায়ানা এক নজিরবিহীন রূপান্তরের সাক্ষী হয়েছে।
-
২০২২: দৈনিক উৎপাদন ~৩.৪ লক্ষ ব্যারেল
-
২০২৫ (শেষ): দৈনিক উৎপাদন ৮ লক্ষ ব্যারেলের বেশি
-
২০২৭ (প্রক্ষেপণ): দৈনিক উৎপাদন ~১৩ লক্ষ ব্যারেল
-
২০৩০ (প্রক্ষেপণ): দৈনিক উৎপাদন ~১৭ লক্ষ ব্যারেল
বর্তমানে চারটি কার্যকর FPSO (Floating Production Storage and Offloading) জাহাজ মিলিয়ে প্রায় ৯ লক্ষ ব্যারেল দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ইয়েলোটেইল প্রকল্প চালু হয়ে অতিরিক্ত ২.৫ লক্ষ ব্যারেল ক্ষমতা যোগ করেছে। ২০২৬ ও ২০২৭ সালে উয়ারু ও হুইপটেইল প্রকল্প যুক্ত হলে উৎপাদন আরও দ্রুত বাড়বে।
এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত ১১ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি পুনরুদ্ধারযোগ্য তেল মজুত গায়ানাকে দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চলেছে—ব্রাজিলের পরেই।
ভারতের জ্বালানি সংকট ও বৈচিত্র্যের বাধ্যবাধকতা
ভারত বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল ভোক্তা। ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে ভারতের মোট তেল আমদানি ছিল প্রায় ২৪২ মিলিয়ন টন, অথচ দেশীয় উৎপাদন আটকে রয়েছে মাত্র ২৬ মিলিয়ন টনে। চাহিদা বৃদ্ধির হার বছরে প্রায় ৪–৫ শতাংশ।
রাশিয়া-নির্ভরতার ঝুঁকি
২০২৪ সালে ভারতের মোট তেল আমদানির ৩৮ শতাংশ এসেছিল রাশিয়া থেকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক নিষেধাজ্ঞা—বিশেষত Rosneft ও Lukoil-এর উপর—এই নির্ভরতা কৌশলগত সমস্যায় পরিণত করেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ভারতীয় রিফাইনারিগুলি রুশ তেল কেনা কমাতে বাধ্য হয়।
যদিও সরকারি স্তরে দাবি করা হয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাজারদরে তেল কিনলে আমদানি বিল ২ শতাংশের বেশি বাড়বে না, বাস্তবে সমস্যাটি শুধু দামের নয়—এটি ভূরাজনৈতিক চাপ, মুদ্রা ঝুঁকি এবং নীতিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন।
গায়ানা: ভারতের জন্য কৌশলগত উত্তর
গায়ানা ভারতকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেয়:
-
নিষেধাজ্ঞামুক্ত সরবরাহ
-
দ্রুত বাড়তে থাকা উৎপাদন ক্ষমতা
-
ভূরাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক নিরপেক্ষ অবস্থান
২০২৫ সালে গায়ানা থেকে ভারত প্রায় ৬ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। Indian Oil Corporation ও Hindustan Petroleum Corporation মিলিয়ে ২০২৫–২৬ সময়কালের জন্য প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেলের চুক্তি করে। এটি “প্রুফ অব কনসেপ্ট” হিসেবে কাজ করেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গায়ানার ভারতীয় হাইকমিশনার ভারতীয় সংস্থাগুলিকে শুধু ক্রেতা নয়, সরাসরি আপস্ট্রিম অপারেটর হিসেবে ২০২৬ সালের ব্লক নিলামে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
বাণিজ্যিক যুক্তি: খরচ, মান ও ভূতত্ত্ব
১. উৎপাদন খরচ
গায়ানার তেল উৎপাদনের ব্রেক-ইভেন খরচ আনুমানিক ৩৬ ডলার/ব্যারেল, যা বিশ্ব গড়ের (৫০–৬০ ডলার) অনেক নিচে। কিছু বিশ্লেষণে ExxonMobil-এর কার্যকরী খরচ মাত্র ২৮–৩০ ডলার/ব্যারেল।
২. তেলের মান
গায়ানার তেল মূলত লাইট ও সুইট ক্রুড—যা ভারতীয় রিফাইনারিগুলির জন্য আদর্শ। ভারী ভেনেজুয়েলার তেলের মতো ব্যয়বহুল আপগ্রেডিং ইউনিটের প্রয়োজন পড়ে না, ফলে মোট ল্যান্ডেড কস্ট কমে।
৩. গভীর সমুদ্রের সুবিধা
স্ট্যাব্রোক ব্লকের গভীরতা ১৫০০–২০০০ মিটার—আধুনিক FPSO প্রযুক্তিতে সহজলভ্য, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়বহুল আল্ট্রা-ডিপওয়াটার নয়। উচ্চ পোরোসিটি স্যান্ডস্টোন রিজার্ভার উৎপাদন দক্ষতা বাড়ায়।
২০২৬ সালের নিলাম: ভারতীয় সংস্থার জন্য পথ
গায়ানা তিনটি স্পষ্ট পথ খুলে দিয়েছে:
-
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ব্লক নিলাম – যেখানে নতুন খেলোয়াড় আনার উপর জোর।
-
সরকার-টু-সরকার আলোচনার মাধ্যমে ব্লক বরাদ্দ – বিশেষত স্ট্যাব্রোক ব্লকের পরিত্যক্ত অংশে। এখানে ONGC Videsh গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
-
ডাউনস্ট্রিম ও অবকাঠামো বিনিয়োগ – গ্যাস-টু-এনার্জি, রিনিউএবল, পাইপলাইন ও রিফাইনিং প্রকল্পে।
ভারত–গায়ানা বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্ক
২০২৪ সালের নভেম্বরে Narendra Modi-র ঐতিহাসিক গায়ানা সফরের মাধ্যমে এই অংশীদারিত্ব নতুন মাত্রা পায়। জানুয়ারি ২০২৪-এ দুই দেশ পাঁচ বছরের হাইড্রোকার্বন সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
জ্বালানির বাইরে অবকাঠামো, শিক্ষা, ডিজিটাল পরিষেবা ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে ভারতীয় সংস্থাগুলির উপস্থিতি বিনিয়োগ ঝুঁকি কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করে।
চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা
-
ONGC Videsh-এর মিশ্র ট্র্যাক রেকর্ড
-
ভবিষ্যতে ফিস্কাল শর্ত পরিবর্তনের সম্ভাবনা
-
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি রূপান্তরের চাপ
তবে গায়ানার কম খরচের “লো-কার্বন ব্যারেল” ভবিষ্যতের বাজারেও টিকে থাকার সম্ভাবনা রাখে, বিশেষত ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য।
উপসংহার
গায়ানার তেল খাতে ২০২৬ সালে ভারতীয় সংস্থাগুলির প্রবেশ একটি বিরল কৌশলগত সুযোগ। রাশিয়া-নির্ভরতা কমানো, নিষেধাজ্ঞার চাপ এড়িয়ে চলা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি ভারতের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
এই সুযোগ সময়সীমাবদ্ধ। ২০২৬ সালের নিলামে অংশগ্রহণ ভারতের জন্য শুধু বাণিজ্যিক লাভ নয়, বরং ভবিষ্যতের শক্তি-স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত হতে পারে। “এনার্জি জ্যাকপট” শব্দটি যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে এর কৌশলগত গুরুত্ব তার চেয়েও গভীর।
এই বিশ্লেষণটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন এবং ভারতের জ্বালানি ভূরাজনীতি নিয়ে আরও লেখা পড়তে ব্লগটি অনুসরণ করুন।