দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক জটিল দলিল। প্রায় আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই উৎসবের আকার, অর্থ ও উদ্দেশ্য বারবার রূপান্তরিত হয়েছে। কখনো এটি ছিল দেবীতত্ত্বের উত্থানের প্রতীক, কখনো জমিদারি ক্ষমতার প্রদর্শনী, কখনো ঔপনিবেশিক সহযোগিতার মঞ্চ, আবার কখনো জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধের প্রতীক। এই উৎসবের “ঐতিহাসিক সত্য” একরৈখিক নয়; এটি বহুস্তরবিশিষ্ট, বিতর্কিত ও পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যায় ভরপুর।
এই প্রতিবেদনে দুর্গাপূজার ইতিহাসকে পাঁচটি স্তরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে—
(১) বৈদিক ও পৌরাণিক ভিত্তি,
(২) প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ,
(৩) মধ্যযুগীয় বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ,
(৪) ঔপনিবেশিক রূপান্তর ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতি,
(৫) দলিত-আদিবাসী পাল্টা-বয়ান ও কৃষিভিত্তিক উৎস।
১. বৈদিক ও পৌরাণিক ভিত্তি: শক্তিতত্ত্বের উত্থান
দুর্গাপূজার মূল দর্শন নিহিত “শক্তি” ধারণায়। ঋগ্বেদ ও অথর্ববেদের বিভিন্ন স্তোত্রে এক সর্বব্যাপী নারীসত্তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যিনি সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংসের শক্তির আধার। তবে দেবীকে সর্বোচ্চ ব্রহ্মতত্ত্ব হিসেবে পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করা হয় খ্রিস্টীয় পঞ্চম–ষষ্ঠ শতকে রচিত দেবীমাহাত্ম্য বা দুর্গাসপ্তশতী গ্রন্থে।
এই গ্রন্থেই প্রথম স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়—দেবী কেবল বিষ্ণু বা শিবের শক্তি নন, তিনিই পরম সত্য (আদি পরাশক্তি)। এখানে দুর্গা কোনো পুরুষ দেবতার সহচরী নন, বরং সমস্ত দেবতাই তাঁর শক্তির অংশমাত্র।
মহিষাসুর বধের কাহিনি এই দর্শনের কেন্দ্রে। পুরাণ অনুযায়ী, মহিষাসুর এমন বর পেয়েছিল যে কোনো পুরুষ বা দেবতা তাকে বধ করতে পারবে না। তখন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরসহ সমস্ত দেবতার সম্মিলিত তেজ থেকে দুর্গার আবির্ভাব। এখানে একটি বিপ্লবী দার্শনিক উলটপালট ঘটে—পুরুষ দেবতারা অসহায়, নারীশক্তিই চূড়ান্ত মুক্তিদাতা।
এই কাহিনি শুধু ধর্মীয় নয়, দার্শনিক ঘোষণাও বটে: চূড়ান্ত শক্তি পুরুষতান্ত্রিক নয়, শক্তিতান্ত্রিক।
২. প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ: সর্বভারতীয় বিস্তার
লিখিত গ্রন্থের পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দেখায়, মহিষাসুরমর্দিনী রূপে দুর্গার উপাসনা খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকেই বিস্তৃত হতে শুরু করে।
প্রাচীনতম নিদর্শন
- রাজস্থান ও মধ্যভারতের টেরাকোটা ফলক (খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতক)
- পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্রকেতুগড়ে প্রাপ্ত যক্ষী ও মাতৃদেবী মূর্তি
- মথুরা ও সাঁচির গুপ্তযুগীয় ভাস্কর্য
৫ম থেকে ৮ম শতকের মধ্যে দুর্গামূর্তি ভারতের প্রায় সর্বত্র দেখা যায়:
- উত্তর ভারতে গুপ্ত ও পরবর্তী মন্দিরে
- দাক্ষিণাত্যে চালুক্য ও রাষ্ট্রকূট শিল্পে
- দক্ষিণ ভারতে মহাবলীপুরমের পল্লব গুহামন্দিরে
- ইলোরা কৈলাস মন্দিরে বিশাল মহিষাসুরমর্দিনী ভাস্কর্য
এই বিস্তার প্রমাণ করে যে দুর্গা উপাসনা কোনো আঞ্চলিক ধর্ম নয়; এটি ধীরে ধীরে সর্বভারতীয় হিন্দু কাঠামোর অংশে পরিণত হয়।
তবে বহু প্রত্নতাত্ত্বিকের মতে, এই দেবী আর্য-পূর্ব স্থানীয় মাতৃদেবী ও উর্বরতা উপাসনার সঙ্গে মিশে নতুন রূপ লাভ করেন।
৩. মধ্যযুগীয় বাংলা: পূজার প্রাতিষ্ঠানিক জন্ম
দুর্গাপূজা “উৎসব” হিসেবে সংগঠিত ও বিধিবদ্ধ হয় মূলত মধ্যযুগীয় বাংলায়।
১১–১২ শতকে রচিত বিভিন্ন সংস্কৃত পূজাপদ্ধতি গ্রন্থে দুর্গাপূজার নির্দিষ্ট আচার, মন্ত্র ও সময়সূচি লিপিবদ্ধ হয়। এর চূড়ান্ত রূপ দেন নবদ্বীপের পণ্ডিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য (১৬শ শতক) তাঁর দুর্গাপূজাতত্ত্ব গ্রন্থে।
তিনিই প্রথম—
- মূর্তি নির্মাণ,
- বোধন, অধিবাস, সন্ধিপূজা,
- নবপত্রিকা স্নান,
- বিসর্জন
এই সবকিছুকে একটি একক ধর্মীয় কাঠামোয় সংহত করেন।
বসন্ত থেকে শরৎ: ঐতিহাসিক পরিবর্তন
প্রাচীনকালে দুর্গাপূজা মূলত বসন্তে (বাসন্তী পূজা) হত। শরৎকালের পূজার ধর্মীয় ব্যাখ্যা দেওয়া হয় রামায়ণের “অকালবোধন” কাহিনির মাধ্যমে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এটি কৃষিভিত্তিক সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত—শরৎ ছিল ফসল তোলার সময়, ঐশ্বর্যের মৌসুম।
প্রথম নথিভুক্ত পূজা
- ১৫৮৩: মালদহের জমিদার পরিবার
- ১৬০৬: দিনাজপুর রাজবংশ
- ১৬১০: কলকাতার সাবর্ণ চৌধুরী পরিবার (আজও চলমান)
এই পূজাগুলি ছিল জমিদারি দরবারি অনুষ্ঠান—জনসাধারণ নয়, অভিজাত শ্রেণির শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ।
৪. ঔপনিবেশিক যুগ: ক্ষমতা, ভোগ ও রাজনীতি
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার সমাজ কাঠামো আমূল বদলে যায়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্রছায়ায় নতুন ধনী শ্রেণি গড়ে ওঠে—ব্যবসায়ী, দেওয়ান, ঠিকাদার ও নতুন জমিদার।
এই শ্রেণি দুর্গাপূজাকে ব্যবহার করে তিনটি উদ্দেশ্যে:
১. ব্রিটিশ আনুকূল্য অর্জন
২. সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন
৩. প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবারের উপর প্রভাব বিস্তার
ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরীর ভাষায়, এই সময় পূজার কেন্দ্রে ভক্তির চেয়ে “conspicuous consumption” বড় হয়ে ওঠে।
সোনা-রুপার সাজ, নর্তকী, আতশবাজি, ইংরেজ অতিথি—সবই ছিল ক্ষমতার মুদ্রা।
বারোয়ারি বিপ্লব
১৭৬১/১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় ১২ বন্ধু প্রথম চাঁদাভিত্তিক “বারোয়ারি পূজা” চালু করেন। এটি ছিল ঐতিহাসিক মোড়—জমিদারি নিয়ন্ত্রণ ভেঙে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ।
১৯২৬ সালে মানিকতলায় প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম “সার্বজনীন পূজা”।
৫. জাতীয়তাবাদী রূপান্তর: দেবী থেকে দেশমাতা
উনিশ শতকের শেষভাগে দুর্গাপূজা রাজনৈতিক রূপ লাভ করে।
১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসে “বন্দেমাতরম্” গান ও “মাতৃমূর্তি” ধারণা জনপ্রিয় হয়। দেবী দুর্গা জাতিতে রূপান্তরিত হন—তিনি আর শুধু ধর্মীয় দেবী নন, তিনি ভারতমাতা।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর পূজামণ্ডপগুলো হয়ে ওঠে স্বদেশী আন্দোলনের ঘাঁটি।
- ইংরেজ আমন্ত্রণ বর্জন
- মূর্তিতে ব্রিটিশ শাসকের রূপকে অসুর হিসেবে দেখানো
- বিপ্লবী সংগঠনের গোপন বৈঠক
- চাঁদা সংগ্রহ
দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে ধর্মীয় আবরণের ভেতর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক মঞ্চ।
৬. বিতর্কিত পাল্টা ইতিহাস: মহিষাসুর ও আদিবাসী পাঠ
২০শ শতকের শেষভাগে দলিত ও আদিবাসী চিন্তাবিদেরা মহিষাসুর কাহিনির এক বিকল্প ব্যাখ্যা উত্থাপন করেন।
তাঁদের মতে:
- মহিষাসুর কোনো “অসুর” নয়, তিনি ছিলেন আদিবাসী/অনার্য শাসক।
- “মহিষ” ছিল কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রতীক।
- দুর্গা-পুরাণ বিজয় আসলে আর্য সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতীকী কাহিনি।
এই পাঠ অনুযায়ী দুর্গাপূজা বিজয়ের উৎসব নয়, পরাজিত জনগোষ্ঠীর স্মৃতিমোছার আচার।
এই ব্যাখ্যা মূলধারার হিন্দু তত্ত্বের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, কিন্তু এটি ভারতের বর্ণ, ভূমি ও ক্ষমতার ইতিহাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।
৭. কৃষিভিত্তিক উৎস ও নবপত্রিকা
দুর্গাপূজার বহু আচার—নবপত্রিকা, কলাবউ, জল, বৃক্ষ ও শস্য উপাসনা—ইঙ্গিত দেয় প্রাচীন প্রকৃতি ও উর্বরতা পূজার দিকে।
নয়টি উদ্ভিদ:
- কলা
- কচু
- ধান
- হলুদ
- আখ
- ডালিম
- অশোক
- বেল
- মানকচু
এসবই কৃষিভিত্তিক সমাজের জীবনচিহ্ন। দেবীমূর্তি এই প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে এক ব্রাহ্মণ্য রূপে সংহত করেছে।
উপসংহার: একাধিক সত্যের সহাবস্থান
দুর্গাপূজা কোনো একক ঐতিহাসিক সত্য বহন করে না। এটি এক “পালিম্পসেস্ট”—প্রতিটি যুগ আগের অর্থের উপর নতুন অর্থ লিখে গেছে।
- এটি শক্তিতত্ত্বের বিজয়
- এটি আঞ্চলিক সংস্কৃতির সর্বভারতীয়ীকরণ
- এটি জমিদারি ক্ষমতার প্রদর্শনী
- এটি ঔপনিবেশিক সহযোগিতা
- এটি জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ
- এটি আদিবাসী স্মৃতির সঙ্গে সংঘর্ষ
- এটি কৃষিভিত্তিক সমাজের উৎসব
আজকের দুর্গাপূজা একযোগে ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই বহুত্বই তার প্রকৃত ঐতিহাসিক সত্য।