ভেনেজুয়েলা আগ্রাসন ও ভারতকে শুল্ক হুমকি: ভাঙনের মুখে বিশ্বব্যবস্থা

 ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। একইসঙ্গে ভারতের ওপর শুল্ক হুমকি প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্র এখন বাণিজ্য ও শক্তিকে একযোগে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ

ভূমিকা: একটি যুগান্তকারী মোড়

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান “অ্যাবসোলিউট রিজলভ” (Operation Absolute Resolve) কেবল একটি আঞ্চলিক সামরিক পদক্ষেপ নয়; এটি শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতিসমূহের ওপর সরাসরি আঘাত। এই অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে, দেশটির ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি Nicolás Maduro-কে সামরিক শক্তির মাধ্যমে আটক করে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত করে।

এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা—যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে “চালাবে” এবং দেশটির বিশাল তেল সম্পদ ব্যবহার করবে—আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একটি স্পষ্ট হেজেমোনিক ঘোষণা। একই সময়ে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির কারণে ভারতের ওপর শুল্ক আরোপের প্রকাশ্য হুমকি ইঙ্গিত দেয়, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে দুটি গভীর পরিবর্তন ঘটেছে:

  1. বহুপাক্ষিক নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা থেকে সরে এসে একতরফা শক্তি প্রয়োগ

  2. বাণিজ্য ও শুল্কনীতিকে সরাসরি রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপের অস্ত্রে রূপান্তর

এই দুই প্রবণতা মিলেই বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে।
us-venezuela-operation-global-order
মার্কিন একতরফা সামরিক পদক্ষেপ ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

অধ্যায় I: অভিযানটির বৈধতা ও আন্তর্জাতিক আইনি নজির

“অ্যাবসোলিউট রিজলভ” অভিযানে ২০টিরও বেশি মার্কিন বিমানঘাঁটি থেকে ১৫০-এর অধিক যুদ্ধবিমান, ডেল্টা ফোর্স, FBI Hostage Rescue Team এবং নৌ অবরোধ বাহিনী একযোগে অংশ নেয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই অভিযানের আগে মার্কিন কংগ্রেসকে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়নি, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে কোনো বৈধ প্রত্যর্পণ (extradition) আবেদনও করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি স্পষ্টতই United Nations Charter-এর অনুচ্ছেদ ২(৪)-এর লঙ্ঘন, যেখানে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ। এই অভিযান একই সঙ্গে:

  • অ-হস্তক্ষেপ নীতির লঙ্ঘন

  • রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান

  • প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক কাঠামো ভঙ্গ

জাতিসংঘের মহাসচিব এই পদক্ষেপকে “বিপজ্জনক নজির” বলে আখ্যা দেন। বহু আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ফলে যে ক্ষয় শুরু হয়েছিল, ভেনেজুয়েলা সেই ক্ষয়ের চূড়ান্ত ভাঙনবিন্দু

১৯৮৯ সালের পানামা আগ্রাসনের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়। তখনও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সেটিকে আন্তর্জাতিক আইনের “স্পষ্ট লঙ্ঘন” বলেছিল। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিক হস্তক্ষেপ নয়, সরাসরি শাসন ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাচ্ছে—যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নগ্ন।


অধ্যায় II: সম্পদ নিয়ন্ত্রণ—আসল কৌশলগত উদ্দেশ্য

ট্রাম্পের বক্তব্যে ভেনেজুয়েলার তেলকে “আমেরিকার কাছ থেকে চুরি হওয়া সম্পদ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবতা হলো—ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত অপরিশোধিত তেল মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্ব মোট মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ। এটি সৌদি আরব, ইরান ও কুয়েত—তিন দেশের সম্মিলিত মজুতের চেয়েও বেশি।

তবে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত ধ্বংসের কারণে উৎপাদন নেমে এসেছে দৈনিক প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেলে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ১ শতাংশেরও কম।

মার্কিন কৌশলগত হিসাব তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো:

  1. মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো

  2. অতিরিক্ত সরবরাহের মাধ্যমে রাশিয়া ও ইরানের তেল আয় কমানো

  3. লাতিন আমেরিকায় চীন ও রাশিয়ার প্রভাব নির্মূল করা

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। PDVSA-এর হিসাব অনুযায়ী উৎপাদন পুনরুদ্ধারে অন্তত ৫৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, আর সামগ্রিক পুনর্গঠনে ১০ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ দরকার। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে আগ্রহী নয়।

এর ওপর আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে বিশ্ব তেলবাজারে দৈনিক ৩.৮৫ মিলিয়ন ব্যারেল অতিরিক্ত সরবরাহ থাকবে। অর্থাৎ ভেনেজুয়েলার তেল বাজারে এলে দাম আরও কমবে—যা যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেল শিল্পের জন্যও ক্ষতিকর।


অধ্যায় III: লাতিন আমেরিকার প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—লাতিন আমেরিকার প্রায় সব প্রধান দেশ এই অভিযানের বিরোধিতা করেছে। স্পেন, ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও উরুগুয়ে যৌথ বিবৃতিতে একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও আঞ্চলিক শান্তির জন্য হুমকি বলে অভিহিত করে।

ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুলা দা সিলভা—যিনি নিজেও মাদুরোর নির্বাচনী বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন—বলেছেন, এই অভিযান “অগ্রহণযোগ্য সীমা অতিক্রম করেছে” এবং এটি লাতিন আমেরিকায় অতীতের হস্তক্ষেপমূলক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি।

এটি নিছক বক্তব্য নয়। কলম্বিয়া সীমান্তে সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে, শরণার্থী ঢলের আশঙ্কায়। কিউবা একে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ” বলে ঘোষণা করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রঘেঁষা আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইও এই ইস্যুতে একঘরে হয়ে পড়েছেন।


অধ্যায় IV: ভারত—অর্থনৈতিক চাপের নতুন লক্ষ্য

ভেনেজুয়েলা অভিযানের সমান্তরালে ট্রাম্প ভারতের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট হুমকি দেন—রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ না করলে শুল্ক বাড়ানো হবে। বাস্তবে ২০২৫ সালের আগস্টেই ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল।

২০২২–২০২৫ সময়কালে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়িয়ে মোট আমদানির ৩৫–৪০ শতাংশে নিয়ে যায়, যার ফলে বছরে প্রায় ৯–১১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হয়েছে। এটি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কিন্তু মার্কিন চাপ ভারতের সামনে কঠিন দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে:

  • রাশিয়ান তেল কমালে ব্যয় বাড়বে, মূল্যস্ফীতি ও শিল্পক্ষতি হবে

  • চালু রাখলে মার্কিন শুল্ক ও বাণিজ্য বাধার ঝুঁকি

ডিসেম্বর ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী ভারতীয় আমদানি আবার ছয় মাসের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে—যা ইঙ্গিত দেয়, দিল্লি এখনো নতি স্বীকার করছে না। তবে শক্তির অসমতা স্পষ্ট।


অধ্যায় V: বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া ও বাস্তব সীমাবদ্ধতা

চীন ও রাশিয়া অভিযানের নিন্দা করলেও সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত, চীন পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করার সামর্থ্য রাখে না। ফলে তাদের প্রতিক্রিয়া কূটনৈতিক ও প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।

এই বাস্তবতা দেখায়—যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাববলয়ে এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তি, এবং চ্যালেঞ্জগুলো মূলত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই আসবে।


অধ্যায় VI: আন্তর্জাতিক নিয়মের ক্ষয় ও ব্যবস্থাগত বিপদ

এই ঘটনা দুটি প্রবণতাকে প্রতিষ্ঠা করছে:

  1. বলপ্রয়োগের স্বাভাবিকীকরণ

  2. আন্তঃনির্ভরশীলতাকে অস্ত্রে পরিণত করা

যদি যুক্তরাষ্ট্র অপরাধ দমন বা সম্পদ নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে সার্বভৌম রাষ্ট্রে হামলা চালাতে পারে, তবে অন্য শক্তিরাও একই যুক্তি ব্যবহার করতে পারে—রাশিয়া জর্জিয়ায়, চীন তাইওয়ানে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক আইন কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে শক্তিই নিয়ম নির্ধারণ করবে।


উপসংহার: রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে বিশ্বব্যবস্থা

ভেনেজুয়েলা অভিযান ও ভারতের ওপর শুল্ক হুমকি একসঙ্গে দেখায়—যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে নিয়মভিত্তিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা থেকে সরে এসে লেনদেনভিত্তিক আধিপত্যমূলক কৌশলে প্রবেশ করেছে। আগের যুগে যেখানে মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের আড়ালে কৌশল লুকানো হতো, এখন তা প্রকাশ্য।

ভারতের জন্য বার্তা স্পষ্ট—জ্বালানি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মূল্য বেড়েছে। বহু-মুখী কূটনীতি আগের চেয়ে কঠিন।

এই পথচলা অব্যাহত থাকলে ২০২৬–২০৩০ সময়কাল নির্ধারণ করবে—বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, না কি নতুন কোনো ভারসাম্য খুঁজে পাবে। ভেনেজুয়েলা সেই পরীক্ষার প্রথম বড় অধ্যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যদি আপনার কোনও বিষয়ে ডাউট থাকে বা কোনও বিষয় suggest করতে চান তাহলে মেল করুন!

নবীনতর পূর্বতন

banglafacts 4