By Anthony Ustani
“ভারতকে ধ্বংস করতে গিয়ে নিজেরাই ডুবে গেল”—একটি আত্মঘাতী ভূ-অর্থনৈতিক কৌতুক
গত কয়েক সপ্তাহে সোশ্যাল মিডিয়া ও কিছু রাজনৈতিক ইউটিউব চ্যানেলে একটি জোরালো শিরোনাম ঘুরে বেড়াচ্ছে—
“যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান মিলে ভারতের চাল রপ্তানি ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে”।
শিরোনামটি শুনতে দেশপ্রেমিক, আবেগঘন এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু সমস্যা হলো—এই গল্পের নাটক আছে, প্রমাণ নেই।
বাস্তবতা অনেক বেশি নির্মম, অনেক বেশি অপমানজনক—বিশেষ করে পাকিস্তানের জন্য।
এই লেখায় আমরা দেখব,
-
পাকিস্তানের চাল রপ্তানি সত্যিই কি ৪৬% ধসে পড়েছে?
-
হয়ে থাকলে কেন হয়েছে?
-
সেখানে কি সত্যিই কোনো মার্কিন–পাকিস্তানি “ষড়যন্ত্র” ছিল?
-
নাকি এটা পাকিস্তানের নিজের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর ভারতের বাজারে ফিরে আসার ফল?
আর শেষে প্রশ্ন থাকবে একটাই—
ভারতকে আঘাত করতে গিয়ে কে আসলে নিজেই নকআউট হলো?
অধ্যায় ১: সংখ্যাগুলো মিথ্যে বলে না—পাকিস্তানের রপ্তানি সত্যিই ভেঙে পড়েছে
প্রথমেই পরিষ্কার করা যাক—
পাকিস্তানের চাল রপ্তানি ধস কোনো গুজব নয়। এটি নির্মম সত্য।
২০২৫–২৬ অর্থবর্ষের প্রথম চার মাসে (জুলাই–অক্টোবর):
-
রপ্তানি আয় নেমে এসেছে
১.০৮ বিলিয়ন ডলার → ৫৮১ মিলিয়ন ডলার -
মোট পতন: ৪৬.৪%
-
অর্থনৈতিক ক্ষতি: প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার
শুধু মূল্য নয়, পরিমাণেও ভয়াবহ ধাক্কা:
-
বাসমতি চাল: ↓ ৪৫.৫%
-
নন-বাসমতি (IRRI-6, IRRI-9): ↓ প্রায় ৫০%
এটি পাকিস্তানের কৃষি–রপ্তানি ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ ধসগুলোর একটি।
অর্থাৎ—
👉 সমস্যা বাস্তব। ক্ষতি বাস্তব। ব্যথা বাস্তব।
কিন্তু ব্যাখ্যাটা কি বাস্তব?
অধ্যায় ২: ভারতের সামনে পাকিস্তান—ডেভিড বনাম গোলিয়াথ নয়, বরং দোকানের মালিক বনাম অস্থায়ী ভাড়াটে
একটি তুলনা করলেই পুরো নাটকটা পরিষ্কার হয়ে যায়।
ভারতের অবস্থান
-
FY 2024–25:
২০.১ মিলিয়ন টন রপ্তানি
মূল্য: ১২.৯৫ বিলিয়ন ডলার -
FY 2025–26 (প্রাক্কলন):
২৪ মিলিয়ন টন -
বিশ্ববাজারে অংশীদারিত্ব: ৩০–৪০%
-
লক্ষ্য: ৫৫–৬০%
অন্যদিকে পাকিস্তান?
-
ভারতের অনুপস্থিতির সময় কিছুটা বাজার দখল
-
ভারতের ফিরে আসতেই বাজার উধাও
এটা ষড়যন্ত্র নয়।
এটা হলো—দোকানের আসল মালিক ফিরে এলে অস্থায়ী ভাড়াটে সরে যেতে বাধ্য হয়।
অধ্যায় ৩: আসল কারণ—ভারতের প্রত্যাবর্তন, কোনো ষড়যন্ত্র নয়
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ভারত নন-বাসমতি চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
কারণ?
👉 অভ্যন্তরীণ খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
এই এক সিদ্ধান্তেই পাকিস্তানের জন্য খুলে গিয়েছিল একটি কৃত্রিম স্বর্গ।
-
২০২৩–২৪ সালে:
-
রপ্তানি ভলিউম ↑ ৬০%
-
রপ্তানি মূল্য ↑ ৭৮%
-
পাকিস্তান তখন ভাবতে শুরু করেছিল—
“ভারত বুঝি চিরদিনের জন্য মাঠ ছেড়ে দিল!”
কিন্তু বাস্তবতা হলো—
ভারত কখনোই মাঠ ছাড়েনি। শুধু জুতো বাঁধছিল।
২০২৪–২৫ সালে শক্তিশালী ফসলের পর ভারত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল।
ফলাফল?
-
দাম কম
-
সরবরাহ বিশাল
-
লজিস্টিক নিখুঁত
👉 পাকিস্তানের কৃত্রিম সুবিধা মুহূর্তে উধাও।
এটাই অর্থনীতি।
এটা ষড়যন্ত্র নয়, কম্পিটিশন।
অধ্যায় ৪: ট্রাম্প ট্যারিফ—পাকিস্তানের জন্য আশীর্বাদ, তবু লাভ হলো না
এবার আসা যাক সবচেয়ে হাস্যকর অংশে।
২০২৫ সালের আগস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প কী করলেন?
-
ভারতের বাসমতি চালে শুল্ক:
১০% → ৫০% -
পাকিস্তানের চালে শুল্ক:
২৯% → ১৯%
এখন প্রশ্ন—
যদি যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান মিলে ভারতকে ধ্বংস করতে চাইত, তাহলে—
✔ পাকিস্তানকে সুবিধা দিল কেন?
✔ ভারতকে শাস্তি দিল কেন?
আরো মজার বিষয়—
পাকিস্তানের রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন তখন গর্ব করে বলেছিল:
“আমরা আমেরিকায় রপ্তানি ৮০,০০০ টন থেকে ১ লক্ষ টনে নিয়ে যাব।”
অর্থাৎ—
👉 পাকিস্তান ষড়যন্ত্রকারী নয়, সুযোগসন্ধানী।
সমস্যা একটাই—
আমেরিকা বিশ্ব চাল বাণিজ্যের মাত্র ৩–৫%।
পুরো বিশ্বে ধস নামছে, আর পাকিস্তান ব্যস্ত
“আমেরিকায় একটু বেশি চাল পাঠাব” খেলায়।
অধ্যায় ৫: আসল শত্রু—পাকিস্তানের নিজের প্রশাসন
এবার আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এবং সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশে।
২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তান চালু করল
NAFSA Ordinance।
লক্ষ্য ছিল আধুনিকীকরণ।
ফল হলো—প্রশাসনিক নৈরাজ্য।
-
একেক বন্দরে একেক নিয়ম
-
ইন্সপেকশন বিলম্ব
-
শিপমেন্ট বাতিল
-
রপ্তানিকারকদের বিভ্রান্তি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য—যেখানে পাকিস্তানি বাসমতির বড় বাজার—
সেখানে SPS মানদণ্ড অত্যন্ত কঠোর।
ফলাফল?
-
২০২৪ সালেই
EU আটকে দিয়েছে ৭২টি পাকিস্তানি চাল শিপমেন্ট
বিশ্বাসযোগ্যতা একবার হারালে,
বাজার ফেরত আসে না।
অধ্যায় ৬: প্রকৃতি যখন শত্রু—২০২৫ সালের বন্যা
আরেকটি বাস্তব কারণ—
২০২৫ সালের ভয়াবহ বর্ষা ও বন্যা।
-
পাঞ্জাব অঞ্চলের প্রায় ৬০% ধানক্ষেত ধ্বংস
-
সরবরাহ কমে গেল
-
রপ্তানিযোগ্য উদ্বৃত্তই নেই
এখানে যুক্তরাষ্ট্র কোথায়?
ভারত কোথায়?
ষড়যন্ত্র কোথায়?
অধ্যায় ৭: ভারতের আধিপত্য—ষড়যন্ত্র নয়, দক্ষতা
ভারতের শক্তির উৎস:
-
উৎপাদন: ১৫০ মিলিয়ন টন
-
জমি: ৪৭ মিলিয়ন হেক্টর
-
উৎপাদনশীলতা:
২০১৪–১৫ → ২.৭২ টন/হেক্টর
২০২৪–২৫ → ৩.২ টন/হেক্টর -
ব্র্যান্ডেড বাসমতি
-
দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি নীতি
-
সরকারি সহায়তা
এটা ষড়যন্ত্র নয়।
এটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল।
অধ্যায় ৮: ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কেন জনপ্রিয়?
কারণ সহজ—
-
নিজের ব্যর্থতা মানতে কষ্ট হয়
-
বাইরের শত্রু বানানো সহজ
-
সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগ বিক্রি হয়
কিন্তু বাস্তবতা কঠিন—
✔ মার্কিন নীতিই পাকিস্তানকে সুবিধা দিয়েছিল
✔ পাকিস্তান সেই সুবিধা কাজে লাগাতে পারেনি
✔ ভারতের রপ্তানি টিকে আছে
✔ টাইমলাইন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে মেলে না
চূড়ান্ত রায়
পাকিস্তানের ৪৬% চাল রপ্তানি পতন বাস্তব,
কিন্তু এর কারণ—
-
ভারতের বাজারে প্রত্যাবর্তন
-
পাকিস্তানের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা
-
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তান ষড়যন্ত্রের গল্প রাজনৈতিক কল্পকাহিনি।
ভারতকে আঘাত করতে গিয়ে
👉 পাকিস্তান নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে।
আর যুক্তরাষ্ট্র?
সে বরাবরের মতোই দেখেছে—
কে জিতল, কে হারল—দু’দিক থেকেই লাভ কীভাবে নেওয়া যায়।
সংক্ষেপে বললে:
এটা কোনো ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নয়।
এটা ব্যর্থ শাসন, দুর্বল প্রস্তুতি আর বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষের গল্প।