২০২৫ সাল ভারতের বাণিজ্য ও ভূ-অর্থনৈতিক কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদলের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই বছর ভারত একযোগে তিনটি বড় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement – FTA) সম্পন্ন করেছে—যুক্তরাজ্য, ওমান ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুল আলোচিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি (Bilateral Trade Agreement – BTA) এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এই বাস্তবতা থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে একটি শক্তিশালী বর্ণনা তৈরি হয়েছে—“যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ভারতের ধৈর্য শেষ।”
কিন্তু এই বক্তব্য যতটা সরল ও নাটকীয়, বাস্তবতা ততটা একরৈখিক নয়। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে না; বরং একাধিক বিকল্প খুলে রেখে নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালের এফটিএ গুলোর প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভ, বিনিয়োগ কাঠামো এবং ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—এটি কোনো বিচ্ছেদ নয়, বরং কৌশলগত পুনর্বিন্যাস।
২০২৫ সালের তিনটি ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি
১. ভারত–যুক্তরাজ্য সমন্বিত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি (CETA)
২৪ জুলাই ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত ভারত–যুক্তরাজ্য CETA ভারতের ইতিহাসে অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাণিজ্য চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের বাজারে ভারতের ৯৯ শতাংশ পণ্যের উপর শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে।
এই সুবিধার আওতায় রয়েছে—
-
বস্ত্র ও পোশাক
-
চামড়া ও জুতো
-
রত্ন ও গয়না
-
কৃষিজ পণ্য
-
ইঞ্জিনিয়ারিং গুডস
-
ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যালস
বিশেষভাবে শ্রমনির্ভর খাতগুলিতে এই চুক্তির প্রভাব গভীর হবে, কারণ এই খাতগুলিতে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় কর্মসংস্থান নির্ভর করে।
যুক্তরাজ্য সরকারের হিসাব অনুযায়ী—
-
২০৪০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৫.৫ বিলিয়ন পাউন্ড বৃদ্ধি পাবে
-
যুক্তরাজ্যের জিডিপিতে বছরে ৪.৮ বিলিয়ন পাউন্ড যোগ হবে
-
ভারতে ও যুক্তরাজ্যে মিলিয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে ১০ লক্ষের বেশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে
এই চুক্তির বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৬ সালের মাঝামাঝি।
২. ভারত–ওমান সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (CEPA)
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত ভারত–ওমান CEPA চুক্তিটি উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের জন্য একটি কৌশলগত সাফল্য। এই চুক্তির মাধ্যমে—
-
ওমানের ৯৮.০৮ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে ভারত শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে
-
যা ভারতের মোট রপ্তানির ৯৯.৩৮ শতাংশ মূল্যমানকে কভার করে
এটি কোনো উপসাগরীয় দেশের কাছ থেকে ভারতের পাওয়া সবচেয়ে উদার শুল্ক ছাড়।
এই চুক্তির বিশেষ দিকগুলো হলো—
-
প্রায় ৭ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক ওমানে বসবাস করেন, যাদের উপস্থিতি দুই-তিন শতাব্দী পুরোনো বাণিজ্যিক সম্পর্কের সাক্ষ্য
-
বিশ্বের প্রথম এফটিএ যেখানে আয়ুষ (AYUSH) ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে
-
ভারতের স্বাস্থ্য, যোগ ও ওয়েলনেস শিল্পের জন্য নতুন রপ্তানি বাজার উন্মুক্ত
এই চুক্তিটি ৩ মাসের মধ্যেই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা একে তিনটির মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বাস্তবায়িত চুক্তিতে পরিণত করতে পারে।
৩. ভারত–নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি
২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ভারত–নিউজিল্যান্ড এফটিএ আলোচনার সমাপ্তি ঘটে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত পেয়েছে—
-
১০০ শতাংশ শুল্কমুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার, যা ভারতের ইতিহাসে নজিরবিহীন
নিউজিল্যান্ড এই চুক্তির অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে—
-
আগামী ১৫ বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ
-
বিনিয়োগের ক্ষেত্র: পরিকাঠামো, নবায়নযোগ্য শক্তি, কৃষি প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন
বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্য মূল্য প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগামী পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এটি ভারতের সবচেয়ে দ্রুত সম্পন্ন এফটিএ—মাত্র ৯ মাসে আলোচনা শেষ, যেখানে অতীতে এ ধরনের চুক্তি করতে বহু বছর লেগেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি: কেন এত তাড়াহুড়ো?
ভারতের এফটিএ গতি বৃদ্ধির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির বড় ভূমিকা রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আঘাত
-
৬ আগস্ট ২০২৫: ভারতের পণ্যের উপর ২৫% শুল্ক
-
২৭ আগস্ট ২০২৫: আরও ২৫% শুল্ক, মোট ৫০%
কারণ হিসেবে দেখানো হয়—
-
ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানি
-
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে “পরোক্ষ অর্থায়ন” অভিযোগ
এই শুল্ক প্রযোজ্য হয় প্রায় ৮৭.৩ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় পণ্যের উপর।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাত—
-
বস্ত্র
-
রত্ন ও গয়না
-
সামুদ্রিক খাদ্য
-
অটো কম্পোনেন্টস
এই খাতগুলো সরাসরি লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।
তবুও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি বৃদ্ধি: এক বিস্ময়কর বাস্তবতা
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই উচ্চ শুল্ক সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি হ্রাস পায়নি, বরং বেড়েছে।
-
FY2024: ৭৭.৫১ বিলিয়ন ডলার
-
FY2025: ৮৬.৫১ বিলিয়ন ডলার
অর্থাৎ প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের বৃদ্ধি।
এর কারণ—
-
শুল্কমুক্ত বা আংশিক শুল্কমুক্ত পণ্যের (ইলেকট্রনিক্স, ওষুধ) রপ্তানি বৃদ্ধি
-
সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠন
-
পণ্যের মিশ্রণ পরিবর্তন
যুক্তরাষ্ট্র–ভারত আলোচনা: বন্ধ নয়, চলমান
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়নি। বরং—
-
একটি অন্তর্বর্তী ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে
-
লক্ষ্য: শুল্ক ৫০% থেকে ১৫–১৬% এ নামানো
মুল বিরোধ—
-
যুক্তরাষ্ট্র চায় কৃষিপণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার
-
ভারত চায় শুল্ক ছাড় ও GSP সুবিধা পুনরুদ্ধার
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে উভয় পক্ষই জানিয়েছে—তারা “খুব কাছাকাছি”।
রপ্তানি বৈচিত্র্য: ভারতের বৃহত্তর কৌশল
২০২৫ সালে ভারত—
-
৫০টির বেশি নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়িয়েছে
-
স্পেন, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, চীনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি
রপ্তানির গঠনেও পরিবর্তন—
-
ইলেকট্রনিক্স রপ্তানি বৃদ্ধি ৪১.৯৪%
-
উচ্চ মূল্য সংযোজিত খাতের দিকে ঝোঁক
সরকারি সহায়তা—
-
₹২৫,০৬০ কোটি রপ্তানি প্রণোদনা মিশন
-
₹২০,০০০ কোটি জামানত-মুক্ত ঋণ
-
PLI স্কিম সম্প্রসারণ
বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
ভারত একদিকে—
-
রাশিয়া থেকে প্রায় ৪০% অপরিশোধিত তেল আমদানি করছে
অন্যদিকে— -
কোয়াড, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ
এটাই ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।
উপসংহার: ধৈর্য আছে, কিন্তু দুর্বলতা নেই
“যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ভারতের ধৈর্য শেষ”—এই শিরোনাম আংশিক সত্য। বাস্তবে—
-
ভারত যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ছে না
-
কিন্তু বিকল্প তৈরি করছে
-
দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াচ্ছে
২০২৫ সাল প্রমাণ করেছে—
-
ভারত একযোগে একাধিক উন্নত দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে
-
শুল্ক চাপ সত্ত্বেও রপ্তানি বাড়াতে পারে
-
ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে
যুক্তরাষ্ট্র–ভারত বাণিজ্য চুক্তি এখনও সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। তবে সেই চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ভারত আর অপেক্ষা করে থাকবে না—এই বার্তাই ২০২৫ বিশ্বকে স্পষ্টভাবে দিয়ে দিয়েছে।