মগধ কেন্দ্রিক সাম্রাজ্যসমূহ ও বাংলার উপর তাদের প্রভাব

নন্দ–মৌর্য–শুঙগ যুগে বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর

ভারতের প্রাচীন ইতিহাসে মগধকে কেন্দ্র করে ওঠা তিনটি বিশাল সাম্রাজ্য—নন্দ (৩৪৫–৩২১ খ্রি.পূ.), মৌর্য (৩২২–১৮৫ খ্রি.পূ.) এবং শুঙগ (১৮৫–৭৫ খ্রি.পূ.)—প্রায় তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথকে নির্ধারণ করেছে। যদিও এই সাম্রাজ্যগুলোর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল বর্তমান বিহারের গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চল, তবুও বাংলার ভূখণ্ড নন্দ–মৌর্য–শুঙগ তিন যুগেই সাম্রাজ্যিক প্রশাসন, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিকশিত হয়েছে।

নিম্নে প্রতিটি সাম্রাজ্যের বাংলার উপর প্রভাব বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হলো।


১. নন্দ সাম্রাজ্য: বাংলার প্রথম সাম্রাজ্যিক অন্তর্ভুক্তি

নন্দদের উত্থান ও বিস্তার

মহাপদ্ম নন্দ প্রতিষ্ঠিত নন্দ সাম্রাজ্য ছিল ভারতের অন্যতম প্রথম বিশাল কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্য, যার বিস্তার ছিল হিমালয় থেকে দাক্ষিণাত্য, পাঞ্জাব থেকে বঙ্গদেশ পর্যন্ত। খ্রি.পূ. চতুর্থ শতাব্দীতে বাংলার এই সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া ছিল অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।

সামরিক শক্তি ও বাংলার গুরুত্ব

গ্রিক ইতিহাসকারদের বিবরণ অনুযায়ী, নন্দদের বিশাল সেনাবাহিনীতে ছিল—

  • ২,০০,০০০ পদাতিক
  • ৮০,০০০ অশ্বারোহী
  • ৮,০০০ রথ
  • ৬,০০০ যুদ্ধহাতি

এই বিপুল শক্তি আলেকজান্ডারকেও গঙ্গা অববাহিকার দিকে অগ্রসর না হতে বাধ্য করেছিল। এত বড় সেনাবাহিনী চালাতে প্রচুর অর্থ, শস্য ও সম্পদের প্রয়োজন ছিল, যার উল্লেখযোগ্য অংশই এসেছিল বাংলার উর্বর ভূমি ও বাণিজ্যপথ থেকে।

অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অন্তর্ভুক্তি

নন্দ শাসনকালে—

  • নতুন মুদ্রা প্রচলন,
  • করব্যবস্থা উন্নয়ন,
  • আঞ্চলিক অর্থনীতিকে সাম্রাজ্যিক কাঠামোর সাথে যুক্ত করা

এই সব পদক্ষেপ বাংলাকেও এক বিশাল অর্থনৈতিক জালের অংশে পরিণত করে।

বিশেষত তাম্রলিপ্ত (বর্তমান তমলুক) নন্দদের সময়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসাবে গড়ে ওঠে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সামুদ্রিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নন্দদের পূর্ব ভারতের শাসন

হাথিগুম্ফা লিপিতে উল্লেখ আছে যে এক “নন্দ-রাজা” কলিঙ্গে খাল নির্মাণ করেছিলেন এবং সেখান থেকে জৈন মূর্তি নিয়ে গিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে নন্দদের প্রশাসনিক কাঠামো পূর্ব ভারতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। বাংলাও এই পূর্বাঞ্চলীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ ছিল।


২. মৌর্য সাম্রাজ্য: বাংলায় নগরায়ণ, প্রশাসন ও সাম্রাজ্যিক সংহতি

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দদের ক্ষমতাচ্যুত করে যখন মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, তখন বাংলার রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি আরও দৃঢ় রূপ পায়। এরপর অশোকের আমলে বাংলা এক সুসংগঠিত সাম্রাজ্যিক প্রদেশে পরিণত হয়।

মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি: বাংলায় মৌর্য প্রশাসনের নিশ্চিত প্রমাণ

মহাস্থানগড়ে আবিষ্কৃত সাত-লাইনের ব্রাহ্মী লিপি (৩য় শতাব্দী খ্রি.পূ.) মৌর্য শাসনের নির্দিষ্ট প্রমাণ। লিপিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে—

  • দুর্ভিক্ষপীড়িত জনগণকে
  • তেল, চাল ও কাউড়ি মুদ্রা
    সরবরাহের জন্য একজন মহামাত্রকে নির্দেশ করা হয়েছে।

এটি দেখায়—

  • বাংলায় মৌর্য প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন,
  • দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ গৃহীত হতো,
  • কাউড়ি মুদ্রার ব্যবহার বাংলাকে বৃহত্তর সাম্রাজ্যিক অর্থনীতির সাথে যুক্ত করেছিল।

বাংলার চারটি প্রধান অঞ্চল মৌর্য শাসনে

মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল—

  • বঙ্গ (দক্ষিণ বঙ্গ)
  • অঙ্গ (পশ্চিম বঙ্গ)
  • পুন্ড্রবর্ধন (উত্তর বঙ্গ)
  • সমতট (দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ)

এদের মধ্যে পুন্ড্রবর্ধন ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও জনবহুল অঞ্চল।

তাম্রলিপ্ত: মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রধান সমুদ্রবন্দর

অর্থশাস্ত্র, জাটক কাহিনি এবং চীনা ভিক্ষুদের বিবরণে তাম্রলিপ্তকে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রধান বন্দর বলা হয়েছে।

এখান থেকে রপ্তানি হতো—

  • ইন্ডিগো
  • রেশম
  • তামা
  • সুক্ষ্ম বস্ত্র

এবং এখানে থেকে জাহাজ যেত—

  • সূর্ণভূমি (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া)
  • শ্রীলঙ্কা
  • মালয় উপদ্বীপ

নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো

বাংলার বিভিন্ন প্রাচীন নগরে—মহাস্থানগড়, বাংলাড়, চন্দ্রকেতুগড়— যে সব স্থাপত্য ও শিল্পকর্ম পাওয়া যায় তা মৌর্য যুগে নগরায়ণ ও বাণিজ্যের প্রসারের সাক্ষ্য দেয়।

রিং কূপ, ইটের স্থাপনা, মণি, মুক্তা, অর্ধ-মূল্যবান পাথরের মালা বাংলার নগর সংস্কৃতির বিকাশকে নির্দেশ করে।

কেন্দ্রীয় শাসন ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন

ইতিহাসবিদ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী উল্লেখ করেন যে—

  • মগধের মূল অঞ্চল ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত
  • কিন্তু বাংলা ও অন্যান্য সীমান্ত প্রদেশকে কিছু প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন দেয়া হতো

গ্রিকদের বিবরণে “গঙ্গরিদাই” নামে সমৃদ্ধ এক বঙ্গীয় রাষ্ট্রের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা মৌর্য শাসনের অধীন হলেও স্বকীয় আঞ্চলিক পরিচয় বজায় রেখেছিল।

অশোক ও ধর্মনীতি

যদিও বাংলায় অশোকের প্রধান শিলালিপি পাওয়া যায়নি, তথাপি—

  • বৌদ্ধ ধর্ম
  • বৌদ্ধ সঙ্ঘ
  • বৌদ্ধ শিল্পকলা
    মৌর্য পরবর্তী শুঙগ যুগ পর্যন্ত বাংলায় চলমান ছিল।

৩. শুঙগ সাম্রাজ্য: রাজনৈতিক শিথিলতা, সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতা

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পরে পুষ্যমিত্র শুঙগ মগধে নতুন সাম্রাজ্যের সূচনা করেন। তবে তাদের শাসন বাংলায় অনেকটাই পরোক্ষ ছিল।

রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: বিতর্কিত উপস্থিতি

শুঙগ সাম্রাজ্যের বিস্তার ছিল—

  • মগধ
  • অযোধ্যা
  • বিদিশা
  • মধ্য ভারত
  • পাঞ্জাবের কিছু অংশ

তবে বাংলায় তাদের সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষীণ ছিল। শাসন ছিল অনেকাংশে বিকেন্দ্রীভূত; বিভিন্ন শহর ও জনপদ নিজেদের মুদ্রা নিজেরাই প্রচলন করত।

অতএব, বাংলা শুঙগ প্রশাসনের অংশ হলেও ব্যাপক স্বশাসন ভোগ করত।

বঙ্গের সাংস্কৃতিক পুনরুত্থান

রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলেও শুঙগদের সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য—

১. ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থান

চন্দ্রকেতুগড় ও তমলুকে পাওয়া অসংখ্য টেরাকোটা মূর্তি নির্দেশ করে—

  • ব্রাহ্মণ্য ধর্ম
  • রামায়ণ–মহাভারত কাহিনি
    শুঙগ যুগে বাংলার শিল্পকলায় ব্যাপকভাবে প্রবেশ করে।

২. বৌদ্ধধর্মের ধারাবাহিকতা

শুঙগদের বৌদ্ধবিরোধী হিসেবে দেখানো হলেও বাংলায় বৌদ্ধধর্ম টিকে ছিল। তমলুকে পাওয়া টেরাকোটা ফলক শুঙগ-বৌদ্ধ সহাবস্থানের সাক্ষ্য।

৩. বাণিজ্য ও শহরের বিকাশ

গঙ্গা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণে থাকায় শুঙগেরা বঙ্গদেশের সাথে বাণিজ্যপথ উন্মুক্ত রাখে। তাম্রলিপ্ত বন্দর শুঙগ যুগেও চালু ছিল।

চন্দ্রকেতুগড়: শুঙগ-যুগের শিল্পশহর

বাংলার টেরাকোটা শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলোর একটি হলো চন্দ্রকেতুগড়। এখানে পাওয়া—

  • যক্ষী মূর্তি
  • পারিবারিক দৃশ্য
  • দেব-দেবীর রূপ
  • খেলনা
  • মৃৎপাত্র
  • সিলমোহর

এসব শুঙগ–কুষাণ–গুপ্ত যুগের ধারাবাহিক শিল্পরূপকে প্রকাশ করে।

মুদ্রা ও অর্থনীতি

মৌর্য যুগের পাঞ্চমার্ক মুদ্রা বাংলায় প্রচলিত ছিল। শুঙগদের নিজস্ব প্রতীক—
হস্তী, অশ্ব, সিংহ, জ্যামিতিক চিহ্ন—
যদিও উত্তর ভারতে প্রচলিত ছিল, বাংলায় তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়।

এটি প্রমাণ করে বাংলায় শুঙগ অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সীমিত ছিল।


৪. সাম্রাজ্যিক শাসনের মধ্যেও বাংলার নিজস্ব আঞ্চলিক পরিচয়

নন্দ–মৌর্য–শুঙগ তিন যুগেই বাংলা ছিল সাম্রাজ্যের অংশ; তবুও তার ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলা নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখেছিল।

আঞ্চলিক রাজ্যগুলোর স্থায়িত্ব

বাংলার প্রাচীন ভূমিভাগ—

  • বঙ্গ
  • পুন্ড্র
  • অঙ্গ
  • সমতট

প্রতিটি অঞ্চলই সাম্রাজ্য শাসনের পরও নিজস্ব পরিচয় ধরে রেখেছিল।

অর্থনৈতিক শক্তি

বাংলার—

  • ধান উৎপাদন
  • রেশম শিল্প
  • তাম্রলিপ্ত বন্দর
    বাংলাকে যে কোনও সাম্রাজ্যের জন্য অমূল্য করে তুলেছিল।

অর্থশাস্ত্রে “পৌণ্ড্রক রেশম”-এর উল্লেখ পাওয়া যায়, যা বাংলার বস্ত্রশিল্পের প্রাচীনতা নির্দেশ করে।

সাম্রাজ্যিক সংহতি ও বাংলার উন্নয়ন

মৌর্য প্রশাসন বাংলাকে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত করে—

  • সড়কপথ উন্নয়ন
  • মুদ্রা মান統করণ
  • বাণিজ্যপথ সুরক্ষা
  • নগর উন্নয়ন

এই সব উদ্যোগ বাংলাকে উপমহাদেশীয় অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলে।

পরবর্তী যুগে ধারাবাহিকতা

মৌর্য–শুঙগ পতনের পর গুপ্ত যুগে বাংলা পুন্ড্রবর্ধন ভুক্তি হয়ে আরেক ধাপ নগরায়ণের পথে এগিয়ে যায়।
এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে নন্দ–মৌর্য–শুঙগ যুগে গড়ে ওঠা ভিত্তির উপরই বাংলার পরবর্তী উন্নয়ন দাঁড়িয়ে ছিল।


উপসংহার

নন্দ, মৌর্য ও শুঙগ—এই তিন মগধকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য বাংলার ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে।

  • নন্দ যুগে বাংলা প্রথমবারের মতো একটি বৃহৎ সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ও প্রশাসনে যুক্ত হয়।
  • মৌর্য যুগে বাংলা নগরায়ণ, বাণিজ্য, বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক সংহতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়।
  • শুঙগ যুগে রাজনৈতিক শাসন দুর্বল হলেও বাণিজ্য, শিল্প, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও বৌদ্ধ কার্যক্রম সক্রিয় ছিল।

ফলে, এই তিন সাম্রাজ্য বাংলাকে উপজাতীয় জনপদ থেকে উন্নত নগরসমাজে রূপান্তর করে পরবর্তী গঙ্গাতীরবর্তী সভ্যতার একটি অঙ্গ হিসাবে গড়ে তোলে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যদি আপনার কোনও বিষয়ে ডাউট থাকে বা কোনও বিষয় suggest করতে চান তাহলে মেল করুন!

নবীনতর পূর্বতন

banglafacts 4