মোদীর উজবেকিস্তান সফর ২০২৬: স্বাক্ষরিত ১১ চুক্তি, ইউরেনিয়াম ও কৌশলগত তাৎপর্য

file-00000000bd8482088efa2857e4a59b15

২০২৬ সালের ২৯ ও ৩০ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উজবেকিস্তানের রাষ্ট্রপতি শওকত মিরজিয়য়েভের আমন্ত্রণে তাসখন্দে এক তাৎপর্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর সম্পন্ন করেন। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর চতুর্থ উজবেকিস্তান সফর। এই সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জন হলো ভারত-উজবেকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে পূর্বতন ‘কৌশলগত অংশীদারি’ (Strategic Partnership) থেকে ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারি’ বা ‘সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারি’ (Comprehensive Strategic Partnership)-র স্তরে উন্নীত করা।

সফরের ফলাফল হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ১১টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত ও বিনিময় করা হয় এবং এর পাশাপাশি ৫টি পৃথক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ঘোষণা ও বাণিজ্যিক সমঝোতার কথা প্রকাশ করা হয়। এই সামগ্রিক প্যাকেজের প্রধান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্তম্ভগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বার্ষিক ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা, ভারতের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য একটি নতুন দীর্ঘমেয়াদী ইউরেনিয়াম সরবরাহ ব্যবস্থা চূড়ান্তকরণের অঙ্গীকার, আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল লেনদেন সংযোগ (UPI-UZQR), সংকটপূর্ণ ও কৌশলগত খনিজ (Critical Minerals) উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণ সহযোগিতা এবং চুক্তিগুলোর সময়োপযোগী বাস্তবায়নে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদারকি কাঠামো গঠন।

তবে এই সফরের বাস্তব ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা প্রয়োজন। ভারতীয় পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের জন্য উজবেক ইউরেনিয়াম সরবরাহের চুক্তিটি শীর্ষ বৈঠকে ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়েছে এবং তা দ্রুত স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে বলে জানানো হলেও, আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত ১১টি দলিলের তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। একইভাবে, যৌথ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA) এবং ঘোষিত বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশই বর্তমানে নীতিগত অঙ্গীকার ও আলোচনার স্তরে রয়েছে—এগুলো এখনো চূড়ান্ত বাণিজ্যিক চুক্তিতে রূপান্তরিত হয়নি।

সফরসূচি ও প্রতীকী কূটনীতি

দুই দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় সফরে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পাশাপাশি একাধিক প্রতীকী ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি গুরুত্ব পায়।

তারিখপ্রধান কর্মসূচিকৌশলগত ও প্রতীকী তাৎপর্য
২৯ আগস্ট ২০২৬তাসখন্দ আগমন ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অভ্যর্থনারাষ্ট্রপতি শওকত মিরজিয়য়েভ প্রোটোকল ভেঙে বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে উষ্ণ ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা জানান, যা দুই নেতার গভীর সম্পর্ক ও সফরের উচ্চ মর্যাদাকে প্রতিফলিত করে।
২৯ আগস্ট ২০২৬‘ইয়াঙ্গি উজবেকিস্তান’ (Yangi Uzbekistan) পার্ক পরিদর্শনআধুনিক উজবেকিস্তানের জাতীয় বিকাশ, সার্বভৌমত্ব ও আধুনিকীকরণ দর্শনের প্রতি ভারতের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।
৩০ আগস্ট ২০২৬কুকসারোয় রাষ্ট্রপতি ভবনে আনুষ্ঠানিক বৈঠকশীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলীয় বৈঠক, কৌশলগত নীতি নির্ধারণ এবং ১১টি দ্বিপাক্ষিক দলিল আনুষ্ঠানিক বিনিময়।
৩০ আগস্ট ২০২৬যৌথ সংবাদ সম্মেলনসম্পর্কের স্তর উন্নয়ন (Comprehensive Strategic Partnership), বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
৩০ আগস্ট ২০২৬সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদানপ্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ওলিয় দারাজালি দোস্তলিক’ (Oliy Darajali Do’stlik Order) ভূষিত করা হয়।
৩০ আগস্ট ২০২৬শাস্ত্রী স্মৃতিসৌধ ও প্রাচ্যবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাসখন্দ স্টেট ইউনিভার্সিটি অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের মহাত্মা গান্ধী সেন্টারে ভারতবিদ ও হিন্দি গবেষকদের সঙ্গে মতবিনিময়।
৩০ আগস্ট ২০২৬কিরগিজস্তানের উদ্দেশে তাসখন্দ ত্যাগসাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে বিশকেক যাত্রা (যা এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অংশ নয়)।

স্বাক্ষরিত ১১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MEA) আনুষ্ঠানিক নথি অনুযায়ী স্বাক্ষরিত ১১টি দলিলের বিস্তারিত বিবরণ নিচে উপস্থাপন করা হলো:

১. সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি (Cultural Exchange Programme: 2026–2030)

ভারত ও উজবেকিস্তান সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই কাঠামোর লক্ষ্য ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সাংস্কৃতিক উৎসব, নাট্য ও সঙ্গীত প্রদর্শনী, শিল্পকলা সফর এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের বিস্তার ঘটানো। এটি মূলত দুই দেশের সুপ্রাচীন সিল্ক রোডভিত্তিক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগকে সমসাময়িক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

২. ফায়াজ তেপা ও কারা তেপা সংক্রান্ত আগ্রহপত্র (Letter of Intent)

উজবেকিস্তানের তেরমেজ (Termez) অঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ‘ফায়াজ তেপা’ (Fayaz Tepa) এবং ‘কারা তেপা’ (Kara Tepa)-র ঐতিহাসিক অবশেষ সংরক্ষণ ও সংস্কারের লক্ষ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং উজবেকিস্তানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংস্থার মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মধ্য এশিয়ায় ভারতীয় বৌদ্ধ ঐতিহ্যের বিস্তার এবং সফট-পাওয়ার কূটনীতির ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

৩. মহাফেজখানা সংক্রান্ত সহযোগিতা স্মারক (MoU on Archival Cooperation)

ভারতের জাতীয় মহাফেজখানা (National Archives of India) এবং উজবেকিস্তানের ‘উজআর্কাইভ’ (Uzarchive)-এর মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় ঐতিহাসিক নথি ডিজিটাইজেশন, সংরক্ষণ প্রযুক্তি বিনিময় এবং মধ্য এশিয়া ও ভারতের মধ্যযুগীয় সংযোগ সম্পর্কিত দলিলগুলোর যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে।

৪. আয়ুর্বেদ ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি বিষয়ক সমঝোতা স্মারক

ভারতের আয়ুষ (AYUSH) মন্ত্রণালয় এবং উজবেকিস্তানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে ভেষজ ওষুধ, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং আধুনিক চিকিৎসার সমন্বয়ে যৌথ গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এটি উজবেকিস্তানে ভারতীয় যোগব্যায়াম ও প্রাকৃতিক চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে সুসংগঠিত করবে।

৫. ভূতত্ত্ব ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক

ভারতের খনি মন্ত্রণালয় এবং উজবেকিস্তানের খনি শিল্প ও ভূতত্ত্ব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এই বহুমুখী কৌশলগত সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ভূতাত্ত্বিক জরিপ, আকরিক অনুসন্ধান, প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি এবং কৌশলগত ও সংকটপূর্ণ খনিজ (যেমন লিথিয়াম, তামা, বিরল মৃত্তিকা মৌল) ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা। এটি একটি সাধারণ খনিজ সহযোগিতা স্মারক; এটি দীর্ঘমেয়াদী ইউরেনিয়াম সরবরাহ চুক্তি নয়।

৬. পর্যটন অংশীদারি কর্মসূচি (Tourism Partnership Programme: 2026–2028)

ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং উজবেকিস্তানের পর্যটন কমিটির মধ্যে তিন বছর মেয়াদী এই কর্মসূচি স্বাক্ষরিত হয়। এতে যৌথ বিপণন, উভয় দেশের পর্যটন অপারেটরদের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ও শিক্ষামূলক পর্যটন সম্প্রসারণের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

৭. কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক

ভারতের সুষমা স্বরাজ ইনস্টিটিউট অব ফরেন সার্ভিস (SSIFS) এবং তাসখন্দের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ার্ল্ড ইকোনমি অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসির আওতাধীন ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমির মধ্যে তরুণ কূটনীতিকদের প্রশিক্ষণ, যৌথ কর্মশালা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের উদ্দেশ্যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

৮. অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংলাপ প্রতিষ্ঠা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক

দুই দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংলাপ’ (Economic and Financial Dialogue) চালুর প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে রাজস্ব নীতি, কর সংস্কার, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকে সমন্বয় এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

৯. পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন চুক্তি

ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং উজবেকিস্তানের জাতীয় পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন কমিটির মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মূল ক্ষেত্র হলো জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বন পুনরুদ্ধার এবং মরুকরণ প্রতিরোধ।

১০. উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক

শিক্ষা মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে ভারতের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে উজবেকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌথ ডিগ্রি কর্মসূচি, অধ্যাপক-শিক্ষার্থী বিনিময় এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্র প্রসারিত হবে।

১১. গুজরাট–সমরখন্দ আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তি

ভারতের গুজরাট রাজ্য এবং উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক সমরখন্দ অঞ্চলের মধ্যে এই উপ-জাতীয় (Subnational) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে নগর ব্যবস্থাপনা, শিল্পপার্ক উন্নয়ন, বস্ত্রশিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ এবং পর্যটন ক্ষেত্রে সরাসরি আঞ্চলিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক দলিলের পাঠ্যগত অমিল ও বিবরণগত সূক্ষ্মতা

উভয় দেশের সরকারের প্রকাশিত নথিপত্র বিশ্লেষণে দুটি কাঠামোগত অমিল দৃশ্যমান হয়:

  1. বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বিবরণ: ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তেরমেজের চুক্তিটিকে ফায়াজ তেপা ও কারা তেপা সংরক্ষণের জন্য একটি "লেটার অব ইনটেন্ট" (Letter of Intent) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। অপরপক্ষে, উজবেক রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার "প্রটোকল" (Protocol) হিসেবে অভিহিত করেছে। উভয় বিবরণ একই সমঝোতাকে নির্দেশ করলেও নথির সুনির্দিষ্ট আর্থিক বরাদ্দ বা প্রকল্পের কাজ শুরুর সময়সীমা এখনও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

  2. দলিল সংখ্যার বিভ্রান্তি: উজবেক কর্তৃপক্ষ তাদের তালিকায় শীর্ষ সম্মেলনের ‘যৌথ বিবৃতি’ (Joint Statement)-কে দ্বিপাক্ষিক দলিলের অংশ হিসেবে যুক্ত করেছে, যার ফলে তাদের নথিতে দলিলের সংখ্যা ১২টি বলে প্রতীয়মান হয়। পক্ষান্তরে, ভারত সরকার নীতিগতভাবে যৌথ ঘোষণাকে আলাদা রেখে কেবল স্বাক্ষরিত প্রশাসনিক ও নীতিগত দলিলগুলোকে ‘১১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক’ হিসেবে গণনা করেছে।

পাঁচটি প্রধান নীতিগত ঘোষণা ও বাণিজ্যিক সমঝোতা

১১টি প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তির বাইরে শীর্ষ সম্মেলনে পাঁচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে:

[দ্বিপাক্ষিক ঘোষণার ৫টি প্রধান স্তম্ভ]
 ├── ১. সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারি (Comprehensive Strategic Partnership)
 ├── ২. উরাল সাগর পুনর্বাসনে ১০ লাখ ডলারের অনুদান (Aral Sea Ecological Grant)
 ├── ৩. ১০০টি লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হিন্দি বৃত্তি (Hindi Scholarships)
 ├── ৪. তাসখন্দ প্রাচ্যবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিসিআর সংস্কৃত চেয়ার (ICCR Sanskrit Chair)
 └── ৫. এনআইপিএল-এনআইপিসি ইউপিআই বাণিজ্য চুক্তি (UPI–UZQR Interoperability)
  1. সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারি: দুই দেশের সম্পর্ককে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক স্তরে উন্নীত করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেয়।
  2. উরাল সাগরের পরিবেশগত পুনর্বাসনে ভারতীয় অনুদান: উরাল সাগরের ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ও মরুকরণ মোকাবিলায় ভারত সরকারের ‘গ্রান্ট-ইন-এইড’ (Grant-in-Aid) কাঠামোর আওতায় ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের ঘোষণা।

  3. ১০০টি লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হিন্দি বৃত্তি: উজবেক শিক্ষার্থীদের ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি অধ্যয়নের জন্য প্রতি বছর ১০০টি বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি চালুর ঘোষণা।

  4. সংস্কৃত গবেষণা চেয়ার প্রতিষ্ঠা: ভারতীয় সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পরিষদ (ICCR)-এর উদ্যোগে তাসখন্দ স্টেট ইউনিভার্সিটি অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজে একটি স্থায়ী সংস্কৃত চেয়ার স্থাপন।

  5. NIPL–NIPC বাণিজ্যিক সমঝোতা: ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার আন্তর্জাতিক শাখা (NIPL) এবং উজবেকিস্তানের ন্যাশনাল ইন্টারব্যাংক প্রসেসিং সেন্টারের (NIPC) মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি। এর ফলে ভারতের ‘ইউপিআই’ (UPI) অ্যাপ ব্যবহারকারীরা উজবেকিস্তানের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ‘UZQR’ কোড স্ক্যান করে সরাসরি ভারতীয় মুদ্রায় লেনদেন করতে পারবেন। তবে এটি কার্যকর হতে প্রায় এক বছর সময় লাগবে বলে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগের রোডম্যাপ

দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে বার্ষিক ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) মার্কিন ডলারে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।

বর্তমান বাণিজ্য (~১ থেকে ১.৩ বিলিয়ন ডলার) ──[প্রস্তাবিত রোডম্যাপ]──> ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা (>৫ বিলিয়ন ডলার)

বর্তমানে বাণিজ্য পরিসংখ্যান নিয়ে উভয় পক্ষের কিছুটা ভিন্ন হিসাব রয়েছে: ভারতের বক্তব্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রমের কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে উজবেক রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের হিসাবে পূর্ববর্তী বছরে বাণিজ্য ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই ফারাকটি মূলত বিভিন্ন আর্থিক বর্ষ ও শুল্ক গণনার পার্থক্যের কারণে হতে পারে।

এই ৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ৮ দফা সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে:

  • অশুল্ক বাধা নিরসনে ওয়ার্কিং গ্রুপ: অশুল্ক বাধার (Non-tariff barriers) সমাধান এবং বিনিয়োগের আইনি জটিলতা নিরসনে একটি বিশেষায়িত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন।

  • পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ: ওষুধ ও রাসায়নিক পণ্যের বাইরে প্রকৌশল সামগ্রী, মোটরগাড়ি, ইলেকট্রনিক্স ও টেক্সটাইল পণ্যের বাণিজ্য সম্প্রসারণ।

  • ডিজিটাল বাণিজ্য ও এসএমই প্ল্যাটফর্ম: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং ই-কমার্স সংযোগ স্থাপন।

  • মান নিয়ন্ত্রণ ও পারস্পরিক স্বীকৃতি: উভয় দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সরাসরি সমন্বয় ও কোয়ালিটি সার্টিফিকেটের পারস্পরিক স্বীকৃতি (Mutual Recognition Agreements)।

  • বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ নিরসন ব্যবস্থা: বিনিয়োগ পরিবেশ সহজীকরণ এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানের স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেল।

  • বিনিয়োগ সংস্থার যৌথ প্রচার: ‘ইনভেস্ট ইন্ডিয়া’ এবং উজবেকিস্তানের ‘বিনিয়োগ প্রচার সংস্থা’র যৌথ রোডশো ও সেমিনার আয়োজন।

  • অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA): প্রস্তাবিত ভারত-উজবেকিস্তান পিটিএ-র যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (Joint Feasibility Study) শেষ হয়েছে; এবার সময়সীমা নির্ধারণ করে পরবর্তী ধাপের আলোচনা শুরু করা।

  • ব্যবসায়িক সমন্বয় (B2B): বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ভারী প্রকৌশল, ওষুধ এবং অটোমোবাইল শিল্পে দুই দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর অংশীদারি বৃদ্ধি।

উজবেক প্রেসিডেন্সি জানিয়েছে যে শক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, ফার্মাসিউটিক্যালস, ইলেকট্রনিক্স এবং কৃষিক্ষেত্রে ভারতীয় বহুজাতিক সংস্থাগুলোর সাথে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এ সমস্ত বিনিয়োগ চুক্তির আর্থিক অঙ্ক, সংস্থার নাম বা বাস্তবায়ন সময়সূচি প্রকাশ্যে প্রকাশ করা হয়নি।

ইউরেনিয়াম ও কৌশলগত খনিজ সম্পদ

ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল পরমাণু শক্তি কর্মসূচির জন্য কাঁচামাল নিশ্চিত করতে এই সফর ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ।

[খনিজ ও জ্বালানি ক্ষেত্র]
 ├── ১. স্বাক্ষরিত দলিল: ভূতত্ত্ব ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক
 │      ├── ভূগর্ভস্থ জরিপ ও অনুসন্ধান
 │      ├── সংকটপূর্ণ খনিজ (লিথিয়াম, তামা, কোবাল্ট) প্রক্রিয়াকরণ
 │      └── খনিজ সরবরাহ চেইনের সংহতি
 └── ২. প্রক্রিয়াধীন বিষয়: দীর্ঘমেয়াদী ইউরেনিয়াম সরবরাহ চুক্তি
        ├── নীতিগত সম্মতি ও খসড়া চূড়ান্তকরণ পর্যায়ে
        └── সরবরাহ পরিমাণ, মূল্য ও পরিবহন পথ নির্ধারণের কাজ চলমান

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পশ্চিম) সিবি জর্জ প্রেস ব্রিফিংয়ে নিশ্চিত করেন যে, ভারতের শান্তিকামী পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য উজবেকিস্তান থেকে দীর্ঘমেয়াদী ইউরেনিয়াম আমদানির বিষয়ে আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক হয়েছে এবং চুক্তিটি "খুব শীঘ্রই" স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। তবে এই চুক্তিটি সফরের আনুষ্ঠানিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

স্বাক্ষরিত ‘ভূতত্ত্ব ও খনিজ সম্পদ’ সমঝোতা স্মারকটির মাধ্যমে ভারতীয় সংস্থাগুলো উজবেকিস্তানের খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চলে অনুসন্ধান ও যৌথ উত্তোলনের আইনি সুযোগ পাবে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরিতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও উদীয়মান প্রযুক্তি

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কোনো পৃথক নথি স্বাক্ষরিত না হলেও আলোচনায় কৌশলগত নিরাপত্তা সমন্বয় বড় জায়গা দখল করে ছিল।

  • প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যৌথ উৎপাদন: প্রধানমন্ত্রী মোদী স্পষ্ট করেছেন যে, দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক কেবল যৌথ মহড়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; সামরিক সরঞ্জাম যৌথভাবে উদ্ভাবন ও উৎপাদনের (Co-production and Co-development) ওপর জোর দেওয়া হবে।

  • যৌথ সামরিক মহড়া ‘দস্তলিক’ (Dustlik): ২০২৬ সালের এপ্রিলে উজবেকিস্তানের নামানগান প্রদেশে অনুষ্ঠিত ‘দস্তলিক’ মহড়ার সফলতার প্রশংসা করা হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায় এটিকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

  • সন্ত্রাসবাদ দমন: সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদসহ যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে "জিরো টলারেন্স" নীতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। সন্ত্রাসবাদী অর্থায়ন, আশ্রয়স্থল ও তাদের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার আহ্বান জানানো হয়।

  • প্রযুক্তি ও এআই: তাসখন্দে ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড আইটি (NIELIT) এবং স্টার্টআপ হাবের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা ‘আইটি পার্ক তাসখন্দ’ (IT Park Tashkent)-এর সাফল্যকে ভিত্তি করে নিরাপদ, সুরক্ষিত ও দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিকাশে যৌথ গবেষণার অঙ্গীকার করা হয়।

  • মহাকাশ বিজ্ঞান: মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ, দূর অনুধাবন (Remote Sensing) এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি বিনিময়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আঞ্চলিক যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও টেকসই উন্নয়ন

মধ্য এশিয়ার অন্যতম প্রধান ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ হলো উজবেকিস্তানের ‘ডাবল-ল্যান্ডলকড’ (চারপাশে অন্য স্থলবেষ্টিত দেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত) অবস্থান। তাই ভারতের জন্য সরাসরি ট্রানজিট সংযোগ তৈরি করা একটি প্রধান ভূকৌশলগত অগ্রাধিকার।

ভারত (পশ্চিম উপকূল / চাবাহার) ──[আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর]──> ইরান ──> তুর্কমেনিস্তান ──> উজবেকিস্তান (মধ্য এশিয়া)

শীর্ষ বৈঠকে বহুমুখী পরিবহন করিডোর (Multimodal Transport Corridors)-কে সচল ও লাভজনক করার বিষয়ে একমত হওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর (INSTC) এবং চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে আফগানিস্তান বা মধ্য এশীয় রেলপথ ধরে বাণিজ্য খরচ কমানোর আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি উজবেকিস্তানের জাতীয় সড়ক আধুনিকায়ন এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরিতে ভারতীয় প্রকৌশল অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে তাসখন্দ ‘ফার্মা পার্ক’ (Tashkent Pharma Park)-এ ভারতীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ, স্থানীয় উৎপাদন ইউনিট স্থাপন এবং যৌথ বায়োমেডিক্যাল গবেষণাকে উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পর্যটন বিকাশের ক্ষেত্রে উজবেকিস্তানের বর্তমান ৩০ দিনের ভারতীয়দের জন্য ভিসা-মুক্ত সুবিধা এবং দুই দেশের মধ্যে সপ্তাহে চলাচলকারী ১৪টি সরাসরি বিমানের ভূমিকা ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হয়েছে।

বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি কাঠামো

দ্বিপাক্ষিক স্তরের বাইরে বহুপাক্ষিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে:

  • জাতিসংঘ সংস্কার: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদে ভারতের ন্যায্য দাবির প্রতি উজবেকিস্তান তাদের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

  • জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM): ২০২৭–২০৩০ মেয়াদে উজবেকিস্তানের জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টিকে ভারত পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।

  • আন্তর্জাতিক পরিবেশ জোট: ভারত-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সৌর জোট (ISA) এবং ইন্টারন্যাশনাল বিগ ক্যাট অ্যালায়েন্স (IBCA)-এ যোগদানে উজবেকিস্তানের আগ্রহকে ভারত স্বাগত জানিয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতীতে অনেক ঘোষণা যথাযথ তদারকির অভাবে ধীরগতিতে চলেছে—এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি কাঠামো গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি সমস্ত প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে এবং একটি সামগ্রিক বাস্তবায়ন রোডম্যাপ (Implementation Roadmap) তৈরি করবে।

স্বাক্ষরিত বনাম প্রক্রিয়াধীন বিষয়ের সামগ্রিক চিত্র

২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত আইনি চুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিচে তুলে ধরা হলো:

বিষয় / উদ্যোগবর্তমান বাস্তবায়ন স্থিতি (৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুযায়ী)
১১টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক দলিলআনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত, গৃহীত ও বিনিময় সম্পন্ন।
NIPL–NIPC বাণিজ্যিক চুক্তি (UPI/UZQR)চুক্তি স্বাক্ষরিত; প্রযুক্তিগত সংহতি শেষে আগামী এক বছরের মধ্যে চালুর প্রত্যাশা।
সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারিরাজনৈতিক ঘোষণা সম্পন্ন; যৌথ বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিফলিত।
উরাল সাগরের জন্য ১০ লাখ ডলার অনুদানভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘গ্রান্ট-ইন-এইড’ কাঠামোর অধীনে ঘোষিত; অর্থছাড় প্রক্রিয়াধীন।
১০০টি হিন্দি স্কলারশিপ ও সংস্কৃত চেয়ারঘোষিত; বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রশাসনিক কাঠামো প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন।
২০৩০ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্যউচ্চাকাঙ্ক্ষী নীতিগত লক্ষ্যমাত্রা; বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাণিজ্য বাধা অপসারণের ওপর।
দীর্ঘমেয়াদী ইউরেনিয়াম সরবরাহ চুক্তিনীতিগতভাবে আলোচিত ও খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে; তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়নি।
অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA)সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন; নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মূল আলোচনা শুরুর অঙ্গীকার।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যৌথ উৎপাদনকৌশলগত অভিপ্রায়; কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম বা উৎপাদন চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে হয়নি।
যৌথ বেসরকারি বিনিয়োগ পোর্টফোলিওক্ষেত্র চিহ্নিত হয়েছে; সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ অঙ্ক বা প্রকল্প নথি উন্মুক্ত করা হয়নি।
যোগাযোগ ও পরিবহন অবকাঠামো প্রকল্পনীতিগত সমর্থন; কোনো নির্দিষ্ট অর্থায়িত করিডোর চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।
রাষ্ট্রপতির ভারত সফরের আমন্ত্রণরাষ্ট্রপতি মিরজিয়য়েভ আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন; কূটনৈতিক চ্যানেলে তারিখ চূড়ান্ত হবে।
নরেন্দ্র মোদীর এই ২০২৬ সালের তাসখন্দ সফর ভারত-উজবেকিস্তান সম্পর্ককে গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা থেকে বের করে একটি বাস্তবমুখী, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক স্তরে উন্নীত করেছে। ভারতের জন্য এই সফরের প্রধান কৌশলগত স্বার্থ হলো নিজস্ব বেসামরিক পারমাণবিক অবকাঠামোর জ্বালানি নিশ্চিত করা, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে দেওয়া এবং চীনের শক্তিশালী অর্থনৈতিক উপস্থিতির মাঝে মধ্য এশিয়ায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিকল্প শক্তি হিসেবে অবস্থান মজবুত করা। অন্যদিকে উজবেকিস্তানের জন্য ভারতের উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও সুবিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের সুযোগ গ্রহণ দেশটির অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ নীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে ইউরেনিয়াম চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর, অশুল্ক বাধা দূরীকরণ এবং সরাসরি পরিবহন রুটগুলোর বাস্তব কার্যকারিতা প্রমাণের ওপর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যদি আপনার কোনও বিষয়ে ডাউট থাকে বা কোনও বিষয় suggest করতে চান তাহলে মেল করুন!

নবীনতর পূর্বতন

banglafacts 4