পর্ব–১
বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন ডলার (US Dollar) সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মুদ্রা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, তেলের লেনদেন, ঋণ, এমনকি সংকটকালীন আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রেও ডলারের আধিপত্য আজও অটুট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস ব্যবস্থার মাধ্যমে যে বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সূচনা হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ডলার। সময়ের সঙ্গে সেই কাঠামো বদলালেও ডলারের প্রভাব কমেনি। বরং বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, কোভিড-১৯ মহামারি কিংবা সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সময়ও দেখা গেছে—বিশ্বের অধিকাংশ দেশ শেষ পর্যন্ত ডলারের দিকেই ফিরে তাকায়।
তবে গত এক দশকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেক দেশই তাদের পারস্পরিক বাণিজ্যে ডলারের পরিবর্তে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করার উদ্যোগ নিচ্ছে। এই প্রবণতাকে সাধারণভাবে "ডি-ডলারাইজেশন (De-dollarisation)" বলা হলেও বাস্তবে এর প্রকৃতি অনেক বেশি জটিল। কারণ অধিকাংশ দেশ ডলারকে পুরোপুরি বাদ দিতে চাইছে না; বরং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ডলারের উপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে নিজেদের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়াতে চাইছে।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই ভারত ও জাপান একটি নতুন ইয়েন–রুপি (Yen–Rupee) স্থানীয় মুদ্রা নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (Local Currency Settlement Framework) গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই উদ্যোগকে এশিয়ার আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই ডলারের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ, নাকি এটি কেবল একটি সীমিত পরিসরের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সংস্কার?
এই প্রতিবেদনে আমরা সেই প্রশ্নেরই বিশদ বিশ্লেষণ করব।
নতুন ইয়েন–রুপি নিষ্পত্তি ব্যবস্থা কী?
বর্তমানে ভারত ও জাপানের মধ্যে যখন কোনো কোম্পানি আমদানি বা রপ্তানি করে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেনদেনের জন্য মার্কিন ডলার ব্যবহার করা হয়।
ধরা যাক, ভারতের একটি কোম্পানি জাপান থেকে যন্ত্রপাতি আমদানি করছে।
বর্তমান ব্যবস্থায়—
- ভারতীয় কোম্পানি প্রথমে রুপিকে ডলারে রূপান্তর করবে।
- এরপর সেই ডলার জাপানি প্রতিষ্ঠানের কাছে যাবে।
- জাপানি প্রতিষ্ঠান আবার সেই ডলারকে ইয়েনে রূপান্তর করবে।
অর্থাৎ একটি সাধারণ বাণিজ্যিক লেনদেন সম্পন্ন করতে দুইবার বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় করতে হয়।
এর ফলে—
- অতিরিক্ত ব্যাংকিং খরচ হয়,
- বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ফি (Foreign Exchange Cost) বাড়ে,
- সময় বেশি লাগে,
- ডলারের দামের ওঠানামার ঝুঁকিও থাকে।
নতুন ইয়েন–রুপি কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য হলো এই মধ্যবর্তী ডলার ধাপটি বাদ দেওয়া।
অর্থাৎ—
ভারতীয় আমদানিকারক সরাসরি রুপিতে অর্থ প্রদান করবে এবং জাপানি রপ্তানিকারক সরাসরি ইয়েনে অর্থ গ্রহণ করবে। দুই দেশের ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে এই লেনদেনের হিসাব নিষ্পত্তি করবে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও দ্রুত, সস্তা এবং তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিমুক্ত হতে পারে।
এই পরিকল্পনার বিশেষ বৈশিষ্ট্য
এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জাপানের অ-আবাসিক (Non-Resident) প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভারতীয় ব্যাংকে বিশেষ ধরনের হিসাব খোলার অনুমতি দেওয়া।
এর মাধ্যমে—
- ভারতীয় ব্যাংকে ইয়েন বা রুপিতে সরাসরি লেনদেন করা যাবে।
- সীমান্ত পারাপারের অর্থপ্রদান আরও সহজ হবে।
- ব্যবসায়ীদের জন্য ডলারের উপর নির্ভরতা কমবে।
এটি শুধুমাত্র একটি ব্যাংকিং সুবিধা নয়; বরং দুই দেশের আর্থিক অবকাঠামোকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার একটি প্রচেষ্টা।
কেন এখন এই উদ্যোগ?
প্রশ্ন উঠতে পারে—ভারত ও জাপান এখনই কেন এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?
এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
১. বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
গত কয়েক বছরে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
- রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ,
- পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা,
- মার্কিন–চীন প্রতিযোগিতা,
- সরবরাহ শৃঙ্খলের (Supply Chain) পুনর্গঠন,
- ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা—
এসব কারণে অনেক দেশ বুঝতে পেরেছে যে একটি মাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রার উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
যদি কোনো কারণে ডলারে লেনদেন ব্যাহত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২. বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের খরচ কমানো
ডলার ব্যবহার মানেই প্রতিটি লেনদেনে অতিরিক্ত FX Conversion Cost।
বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে এই ব্যয় বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
সরাসরি ইয়েন–রুপি ব্যবস্থায় এই অতিরিক্ত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
৩. ভারত–জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা
ভারত ও জাপানের সম্পর্ক এখন শুধুমাত্র বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
দুই দেশ ইতিমধ্যেই একসঙ্গে কাজ করছে—
- অবকাঠামো উন্নয়নে,
- বুলেট ট্রেন প্রকল্পে,
- সেমিকন্ডাক্টর সহযোগিতায়,
- গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে,
- প্রতিরক্ষা সহযোগিতায়,
- ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা কাঠামোয়।
মুদ্রা সহযোগিতা সেই সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
জাপানের আগের অভিজ্ঞতা
ভারতের সঙ্গে এই উদ্যোগ জাপানের প্রথম নয়।
ইতোমধ্যেই জাপান ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একই ধরনের স্থানীয় মুদ্রা নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করেছে।
২০২৫ সালে সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ৭.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ লেনদেন হয়েছে।
এটি দেখায়—
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে ডলারকে প্রতিস্থাপন না করলেও নির্দিষ্ট অঞ্চলে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই জাপান এখন ভারতের সঙ্গে আরও বড় পরিসরে একই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহী।
ভারতের জন্য এর গুরুত্ব
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদ্যোগের কয়েকটি বড় সুবিধা রয়েছে।
আমদানি ব্যয় কমতে পারে
বিশেষ করে—
- যন্ত্রপাতি,
- শিল্প প্রযুক্তি,
- ইলেকট্রনিক্স,
- অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ
এসব ক্ষেত্রে সরাসরি ইয়েনে লেনদেন হলে খরচ কমতে পারে।
রুপির আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়বে
ভারত বহুদিন ধরেই চায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রুপির ব্যবহার বাড়ুক।
রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, শ্রীলঙ্কা, মরিশাসসহ একাধিক দেশের সঙ্গে ইতোমধ্যে রুপিতে বাণিজ্যের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাপানের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির সঙ্গে রুপিতে লেনদেন শুরু হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতীয় মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তে পারে।
আর্থিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি
যদিও পুরোপুরি ডলারমুক্ত হওয়া সম্ভব নয়, তবুও কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ডলারের উপর নির্ভরতা কমানো ভারতের আর্থিক নীতিকে আরও নমনীয় করতে পারে।
বিশেষ করে যদি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতা বাড়ে, তাহলে বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা ভারতের জন্য একটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করতে পারে।
জাপানের লাভ কী?
জাপানের ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জাপান দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ায় স্থিতিশীল আর্থিক অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়।
ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি মুদ্রা সহযোগিতা জাপানের জন্য—
- নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে,
- ব্যাংকিং সহযোগিতা বাড়াবে,
- আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করবে,
- চীনের ক্রমবর্ধমান আর্থিক প্রভাবের বিকল্প হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
এছাড়া জাপান ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। তাই এই মুদ্রা সহযোগিতা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক অংশীদারিত্বেরও প্রতিফলন।
এটি কি ডলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ?
প্রথম নজরে অনেকের মনে হতে পারে—ভারত ও জাপান ডলারকে বাদ দিতে চাইছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক ভিন্ন।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য ডলারকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং দৈনন্দিন বাণিজ্যে অপ্রয়োজনীয় ডলার ব্যবহার কমানো।
অর্থাৎ এটি একটি Operational Diversification—লেনদেনের পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আনা।
এটি এখনো Global Monetary Order পরিবর্তনের উদ্যোগ নয়।
বরং এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ডলার থাকবে, তবে প্রতিটি লেনদেনে ডলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে না।
পর্ব–২: ডলারের নিরাপত্তা বলয়, এশিয়ার স্থানীয় মুদ্রা উদ্যোগ এবং ভারত–জাপানের জিওইকোনমিক কৌশল
প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি যে ভারত ও জাপান স্থানীয় মুদ্রায় (ইয়েন–রুপি) বাণিজ্যিক লেনদেন সহজ করার জন্য একটি নতুন কাঠামো তৈরির পথে এগোচ্ছে। এই উদ্যোগ দৈনন্দিন বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার কিছুটা কমাতে পারে, ব্যবসার খরচ কমাতে পারে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—যদি ভারত ও জাপান সত্যিই ডলারের উপর নির্ভরতা কমাতে চায়, তাহলে কেন তারা এখনও একটি ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের Bilateral Swap Arrangement (BSA) বজায় রেখেছে? কেন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকটের সময় এখনও ডলারই তাদের প্রধান নিরাপত্তা বলয়?
এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে আমাদের বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার গভীরে যেতে হবে।
Bilateral Swap Arrangement (BSA) কী?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, Bilateral Swap Arrangement (BSA) হলো দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে একটি আর্থিক নিরাপত্তা চুক্তি।
যদি কোনো এক দেশ হঠাৎ বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়ে, তাহলে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অপর দেশ তাকে দ্রুত বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করতে পারে।
এটি অনেকটা একটি জরুরি আর্থিক বীমা (Financial Insurance) বা নিরাপত্তা জালের মতো।
ভারত ও জাপানের মধ্যে এই চুক্তি প্রথম স্বাক্ষরিত হয় ২০০৮ সালে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকটের ধাক্কা সামলাচ্ছিল।
সেই সময় এই চুক্তির আকার ছিল মাত্র ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই তহবিল ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হয়।
বর্তমানে এই ব্যবস্থার আওতায় ভারত প্রয়োজনে ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পেতে পারে।
কেন এই BSA এত গুরুত্বপূর্ণ?
একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা না থাকলে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যেমন—
- বিদেশি ঋণ পরিশোধে সমস্যা,
- আমদানি ব্যাহত হওয়া,
- মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়ন,
- বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়া,
- আর্থিক বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়া।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত ডলার পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বিশ্ববাজারে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক লেনদেন এখনও ডলারেই সম্পন্ন হয়।
তাই BSA-এর মূল উদ্দেশ্য হলো—সংকটের সময় দ্রুত ডলার সরবরাহ করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা
এখানেই একটি বড় বিষয় লক্ষণীয়।
ভারত ও জাপান দৈনন্দিন বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে চাইলেও, সংকটের সময় তারা ইয়েন বা রুপির পরিবর্তে ডলারকেই নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে।
অর্থাৎ—
দৈনন্দিন ব্যবসায় স্থানীয় মুদ্রা,
কিন্তু জরুরি আর্থিক সহায়তায় ডলার।
এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের ভূমিকা এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে।
কেন ডলার এখনও শেষ ভরসা?
অনেকেই মনে করেন, ডলার শুধুমাত্র একটি মুদ্রা।
বাস্তবে ডলার একটি বৈশ্বিক আর্থিক অবকাঠামোর অংশ।
বিশ্বের—
- অধিকাংশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ,
- আন্তর্জাতিক বন্ড,
- আন্তর্জাতিক ঋণ,
- তেল ও গ্যাস বাণিজ্য,
- সমুদ্রপথের বাণিজ্য,
- আন্তঃব্যাংক নিষ্পত্তি,
সব ক্ষেত্রেই ডলার এখনও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
এই কারণেই আর্থিক সংকটের সময় সবাই ডলার চায়।
ডলারের আধিপত্য কতটা?
অনেক দেশ স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের উদ্যোগ নিলেও বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ভিন্ন চিত্র দেখায়।
বর্তমানে—
- বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৫৮ শতাংশ এখনও মার্কিন ডলারে রাখা হয়।
- ইউরোর অংশ প্রায় ২০ শতাংশ।
- জাপানি ইয়েন, ব্রিটিশ পাউন্ড এবং চীনা রেনমিনবি (RMB)-এর অংশ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি এখনও ডলারই।
এশিয়ায় স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের নতুন প্রবণতা
তবে এটাও সত্য যে এশিয়ার বহু দেশ এখন স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে ASEAN দেশগুলো এই বিষয়ে বেশ সক্রিয়।
২০২৩ সালে ASEAN নেতারা সিদ্ধান্ত নেন যে—
- পারস্পরিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো হবে।
- আন্তঃদেশীয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা উন্নত করা হবে।
- QR Code ভিত্তিক সীমান্ত পারাপারের অর্থপ্রদান সহজ করা হবে।
এর ফলে ভবিষ্যতে ইন্দোনেশিয়ার একজন নাগরিক থাইল্যান্ডে গিয়ে সরাসরি নিজ দেশের মুদ্রায় অর্থ প্রদান করতে পারবেন, মধ্যবর্তী ডলার ব্যবহার ছাড়াই।
এটি খুচরা পর্যায়ের আন্তঃদেশীয় পেমেন্টকে অনেক সহজ করে তুলবে।
কেন এশিয়া এই পথে হাঁটছে?
এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।
১. ডলারের ওঠানামা
যখন মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ায়, তখন ডলারের মূল্য বেড়ে যায়।
এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়।
স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন করলে এই ঝুঁকি কিছুটা কমে।
২. নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি
রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর অনেক দেশ উপলব্ধি করেছে—
যদি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ডলারের উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংঘাতের সময় অর্থনৈতিক ঝুঁকিও বাড়ে।
সেই কারণেই অনেক দেশ বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
৩. আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়লে—
- ব্যাংকিং সহযোগিতা বাড়ে,
- লেনদেনের খরচ কমে,
- আঞ্চলিক বাজার আরও শক্তিশালী হয়।
এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সংহতি বৃদ্ধি করে।
ভারত–জাপান বনাম চীনের আর্থিক প্রতিযোগিতা
এই পুরো বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জিওইকোনমিক প্রতিযোগিতা।
বর্তমানে চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রেনমিনবি (RMB)-এর ব্যবহার বাড়ানোর জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
চীন—
- একাধিক দেশের সঙ্গে Currency Swap Agreement করেছে,
- Cross-Border Interbank Payment System (CIPS) তৈরি করেছে,
- Belt and Road Initiative-এর মাধ্যমে RMB-ভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
চীনের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের পাশাপাশি RMB-কে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।
ভারত ও জাপানের কৌশল কী?
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারত ও জাপান একটি ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করছে।
তারা পুরোপুরি ডলারকে বাদ দিচ্ছে না।
বরং—
- স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়াচ্ছে,
- একই সঙ্গে ডলারভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখছে।
এই কৌশলকে অনেক গবেষক Geoeconomic Statecraft বলে উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ মুদ্রানীতিকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
চীনের প্রভাব সীমিত করার কৌশল
আন্তর্জাতিক গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—
ভারত ও জাপান এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলিকে এমন একটি আর্থিক বিকল্প দিতে চায় যেখানে—
- প্রয়োজনে ডলারভিত্তিক নিরাপত্তা থাকবে,
- আবার দৈনন্দিন বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রারও ব্যবহার করা যাবে।
এর ফলে ছোট দেশগুলোকে পুরোপুরি RMB-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হবে না।
অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নয়; এটি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারেরও একটি কৌশল।
তাহলে কি ভারত ডলার ছাড়তে চাইছে?
ভারতের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রুপির ব্যবহার বাড়ানো।
কিন্তু বাস্তবে ভারত এখনও—
- তেল আমদানির বড় অংশ ডলারে করে,
- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশ ডলারে রাখে,
- আন্তর্জাতিক ঋণের বড় অংশ ডলারে গ্রহণ করে,
- বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গেই যুক্ত রয়েছে।
অর্থাৎ ভারতের নীতি হলো Diversification, Not Replacement।
রুপির ব্যবহার বাড়ানো হবে, কিন্তু ডলারকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হবে না।
ভারত–জাপান সম্পর্কের নতুন মাত্রা
এই উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ও জাপান ইতিমধ্যেই—
- QUAD-এর সদস্য,
- ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ঘনিষ্ঠ অংশীদার,
- Supply Chain Resilience Initiative (SCRI)-এর অংশ,
- গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং অবকাঠামো খাতে সহযোগী।
ইয়েন–রুপি কাঠামো সেই বৃহত্তর অংশীদারিত্বকে আর্থিক ক্ষেত্রেও আরও শক্তিশালী করছে।
এটি ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ, ব্যাংকিং সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমন্বয়কে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।