India Nepal Relations 2026: কেন স্থগিত হলো বিক্রম মিশ্রির নেপাল সফর?

ভূমিকা

ভারত–নেপাল কূটনৈতিক উত্তেজনা ২০২৬ সালে বালেন শাহ ও ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রির সফর বিতর্কের রাজনৈতিক কার্টুন
ভারত–নেপাল কূটনৈতিক উত্তেজনা, লিপুলেখ বিতর্ক এবং বালেন সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরা একটি সম্পাদকীয় রাজনৈতিক কার্টুন।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত ও নেপালের সম্পর্ক বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। খোলা সীমান্ত, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা, সামরিক সহযোগিতা এবং মানুষের অবাধ যাতায়াত—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে অনেক সময় “রুটি-বেটি সম্পর্ক” বলা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রির নেপাল সফর হঠাৎ স্থগিত হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে এসেছে দুই দেশের সম্পর্কের ভেতরের অস্বস্তি, অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক অহংকারের বাস্তবতা।

ভারতের পক্ষ থেকে এই সফর ছিল নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বা ‘বালেন’-এর সঙ্গে প্রথম বড় কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা। কিন্তু সফরের আগে যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী ভারতের বিদেশসচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী নন, তখনই সফরটি শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়। বাইরে থেকে এটি একটি “সিডিউলিং সমস্যা” বলে দেখানো হলেও বাস্তবে এটি ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা। আর সেই বার্তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে নেপালের নতুন নেতৃত্বের একধরনের কৃত্রিম শক্তি প্রদর্শন, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়ায় না।

আজকের নেপাল এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ভারতের সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে নিজেদের জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটি দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ বাস্তবতা হলো—ভারত ছাড়া নেপালের অর্থনৈতিক শ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় অসম্ভব। অথচ সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেই বালেন সরকারের আচরণ অনেকটা এমন যেন নেপাল এখন দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সুপারপাওয়ার!


বিক্রম মিশ্রির সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রির সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল না। এটি ছিল নেপালের নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির প্রথম উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের প্রচেষ্টা। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল—

  • বালেন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বোঝা
  • ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করা
  • ভারতের তরফে প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো
  • সীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করা

কিন্তু সফরের আগেই যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী দেখা করবেন না, তখন দিল্লি সফর স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ ভারত বুঝেছিল, যদি তাদের বিদেশসচিবকে প্রকাশ্যে উপেক্ষা করা হয়, তবে সেটি কূটনৈতিকভাবে ভারতের মর্যাদাহানির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হবে।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে—নেপাল কী অর্জন করল?

একটি ছোট অর্থনীতি, ভারতীয় ট্রানজিটের উপর নির্ভরশীল, কর্মসংস্থানের জন্য লক্ষ লক্ষ নাগরিককে ভারতে পাঠানো দেশ যদি ভারতের সঙ্গে অহেতুক ‘ইগো ব্যাটেল’-এ নামে, তাহলে বাস্তবে লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু নেপালের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব মনে করছে, ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলে দেশের তরুণ ভোটারদের কাছে তারা আরও জনপ্রিয় হবে।

এই রাজনীতি নতুন নয়। নেপালের বহু সরকার অতীতে ভারতের বিরুদ্ধে আবেগী বক্তব্য ব্যবহার করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা তাদের দিল্লির কাছেই ফিরিয়ে এনেছে। কারণ ভূগোল বদলানো যায় না।


বালেন শাহ: জনপ্রিয় নেতা নাকি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী জাতীয়তাবাদী?

বালেন্দ্র শাহ বা বালেন মূলত একজন সিটি মেয়র হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তি, সোশ্যাল মিডিয়া-ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রচার এবং তরুণদের সমর্থনের উপর ভর করে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসেন। কিন্তু প্রশাসনিক জনপ্রিয়তা আর আন্তর্জাতিক কূটনীতি এক জিনিস নয়।

নেপালের নতুন নেতৃত্বের মধ্যে একটি প্রবণতা স্পষ্ট—তারা মনে করছে ভারতের সঙ্গে “সমান সমান” ভাষায় কথা বললেই জনগণ তাদের শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি আবেগ দিয়ে চলে না। বিশেষ করে যখন আপনার দেশের—

  • ৬০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য ভারতের সঙ্গে,
  • জ্বালানি সরবরাহের প্রধান উৎস ভারত,
  • সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের জন্য ভারত অপরিহার্য,
  • লক্ষ লক্ষ নাগরিক ভারতে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠায়,
  • এবং খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহেও ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তখন ভারতের সঙ্গে অহংকারের রাজনীতি অনেকটা নিজের পায়ে কুড়াল মারা ছাড়া কিছু নয়।

বালেন সরকারের আচরণে এমন এক ধরনের “ডিজিটাল জাতীয়তাবাদ” দেখা যাচ্ছে যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ার করতালি বাস্তব কূটনৈতিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু ফেসবুক পোস্ট দিয়ে অর্থনীতি চলে না, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, বা ট্রাকভর্তি জ্বালানি কাঠমান্ডুতে পৌঁছায় না।


লিপুলেখ ইস্যু: বাস্তব সমস্যা নাকি রাজনৈতিক অস্ত্র?

ভারত-চীন কৈলাস মানসসরোবর যাত্রা পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্তে নেপাল আপত্তি তুলেছে, কারণ লিপুলেখ অঞ্চল নিয়ে নেপালের দাবি রয়েছে। নেপালের বক্তব্য—ভারত ও চীন নেপালকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ইস্যুতে নেপালের কৌশল কী?

কূটনৈতিক আলোচনা? যৌথ জরিপ? দীর্ঘমেয়াদি সীমান্ত সমাধান?

না। বরং বিষয়টিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করে দেশীয় জাতীয়তাবাদ উস্কে দেওয়া হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো—এই সীমান্ত সমস্যা কয়েক দশকের পুরনো এবং তা রাতারাতি সমাধান হওয়ার নয়।

ভারত ও চীনের মতো দুই পরাশক্তির মাঝখানে অবস্থান করে নেপাল যদি মনে করে শুধুমাত্র উচ্চস্বরে কথা বললেই ভূরাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে, তাহলে সেটি একধরনের কৌশলগত সরলতা। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে আবেগের চেয়ে শক্তি, অর্থনীতি ও অবকাঠামো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আর সবচেয়ে বড় কথা, ভারতকে ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে নেপাল শেষ পর্যন্ত কী লাভ করবে?

চীন কি নেপালের অর্থনীতিকে ভারতের বিকল্প দিতে পারবে?

বাস্তবতা বলছে—না।


নেপালের অর্থনীতি: ভারতের উপর নির্ভরতার বাস্তব চিত্র

অনেক সময় নেপালের রাজনৈতিক মহলে এমনভাবে কথা বলা হয় যেন ভারতকে উপেক্ষা করেও দেশটি অনায়াসে এগিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু অর্থনৈতিক তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি তুলে ধরে।

নেপালের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার ভারত। নেপালের আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ ভারতের সঙ্গে। দেশটির পেট্রোলিয়াম, খাদ্য, ওষুধ, নির্মাণসামগ্রী—সবকিছুর বড় অংশ ভারতীয় রুট দিয়ে আসে।

নেপাল সমুদ্রবন্দরবিহীন দেশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ভারতের বন্দর ব্যবহার ছাড়া কার্যত অন্য কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প নেই।

তার উপর রয়েছে কর্মসংস্থানের বিষয়। লক্ষ লক্ষ নেপালি নাগরিক ভারতে কাজ করেন। তারা যে রেমিট্যান্স পাঠান, তা নেপালের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকারও নেপালের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য অপরিহার্য।

এই বাস্তবতার মাঝেও যদি নেপালের রাজনৈতিক নেতৃত্ব শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদী করতালির জন্য ভারতের সঙ্গে অহংকারের লড়াই শুরু করে, তবে সেটি অর্থনৈতিক আত্মঘাতী প্রবণতা হিসেবেই দেখা হবে।

ভারত হয়তো প্রকাশ্যে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে না, কিন্তু সীমান্তে প্রশাসনিক কড়াকড়ি, আমদানি প্রক্রিয়ায় ধীরগতি বা কূটনৈতিক দূরত্ব—এসবের প্রভাব নেপালের অর্থনীতিতে খুব দ্রুত পড়তে পারে। ইতিহাস বলছে, অতীতেও এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভুগেছে সাধারণ নেপালি জনগণ।


চীন কার্ড: নেপালের সবচেয়ে বড় বিভ্রম?

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলেই নেপালের একাংশের রাজনীতিবিদ মনে করেন চীনই হবে বিকল্প। কিন্তু এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

চীন অবশ্যই নেপালে অবকাঠামো বিনিয়োগ করছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় সড়ক, রেল, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—চীন কি নেপালের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবন চালায়?

না।

নেপালের বাজার, শ্রম, খাদ্য সরবরাহ, ট্রানজিট ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের কেন্দ্র এখনো ভারত। চীন ভৌগোলিকভাবে দূরে এবং হিমালয়ের বাধা বাস্তব। তিব্বত হয়ে ব্যাপক বাণিজ্যিক সংযোগ গড়ে তোলা এখনো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সীমিত।

তার উপর দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ ইতিমধ্যেই চীনা ঋণনির্ভর প্রকল্পের ঝুঁকি দেখেছে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর তার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। ফলে নেপালও বুঝতে শুরু করেছে যে শুধুমাত্র চীনের উপর নির্ভরতা নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

তবু নেপালের কিছু রাজনৈতিক শক্তি ভারতের বিরুদ্ধে চাপ তৈরির জন্য “চীন কার্ড” ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু দিল্লিও এখন আগের মতো সরল নয়। ভারত বুঝে গেছে যে প্রতিবেশী দেশগুলো মাঝে মাঝে বেইজিংকে ব্যবহার করে দর কষাকষির কৌশল হিসেবে। ফলে অতিরিক্ত নাটকীয় অবস্থান অনেক সময় উল্টো ফলও দিতে পারে।


ভারতের ধৈর্য: দুর্বলতা নয়

এই ঘটনার পরও ভারত প্রকাশ্যে খুব সংযত ভাষা ব্যবহার করেছে। দিল্লি সফর “স্থগিত” হয়েছে বলেছে, “বাতিল” নয়। কোনো আক্রমণাত্মক বিবৃতি দেয়নি। এটিই দেখায় যে ভারত এখন প্রতিবেশী কূটনীতিতে অনেক বেশি হিসেবি।

কারণ ভারত জানে—প্রকাশ্য চাপ সৃষ্টি করলে নেপালের অভ্যন্তরীণ জাতীয়তাবাদ আরও বাড়বে এবং সেটি চীনের পক্ষেই যাবে। তাই দিল্লি সম্ভবত “ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ” কৌশল নিয়েছে।

কিন্তু নেপালের রাজনীতিবিদদের এটাও বুঝতে হবে যে ভারতের নীরবতা মানেই অসহায়ত্ব নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তব ভূরাজনীতিতে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ওজন এখনো বিপুল। ভারত চাইলে নেপালের উপর সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভারতের কাছে নেপাল গুরুত্বপূর্ণ হলেও, নেপালের কাছে ভারত অস্তিত্বগতভাবে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই অসম বাস্তবতাকে অস্বীকার করে আবেগী রাজনীতি চালানো দীর্ঘমেয়াদে নেপালের নিজের ক্ষতিই করবে।


নেপালের নতুন প্রজন্মের রাজনীতি: বাস্তববাদ নাকি আবেগ?

‘জেন-জি বিপ্লব’-এর পর নেপালে যে নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি হয়েছে, তা মূলত পুরনো দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে। এই পরিবর্তনের মধ্যে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। তরুণরা স্বচ্ছতা, উন্নয়ন ও জাতীয় মর্যাদার কথা বলছে।

কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন জাতীয় মর্যাদাকে বাস্তব কূটনৈতিক সক্ষমতার পরিবর্তে শুধুমাত্র ভারতের বিরোধিতার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

ভারতকে “চ্যালেঞ্জ” করলেই যে নেপাল শক্তিশালী হয়ে উঠবে, এমন ধারণা রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে তা বিপজ্জনক। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধুমাত্র আত্মসম্মানের ভাষণ নয়; এটি শক্তির ভারসাম্য, স্বার্থ ও নির্ভরতার হিসাব।

নেপালের তরুণ নেতৃত্ব যদি সত্যিই দেশের ভবিষ্যৎ বদলাতে চায়, তাহলে তাদের উচিত হবে—

  • বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা
  • সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আবেগ নয়, কূটনৈতিক আলোচনা করা
  • ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা
  • অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাড়ানো
  • এবং অভ্যন্তরীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া

কিন্তু যদি তারা শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া-চালিত জাতীয়তাবাদে ভেসে যায়, তাহলে নেপাল আরও অস্থির ও নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।


দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ভাবমূর্তি ও বার্তা

নেপালের এই আচরণ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা কিংবা ভুটান—সব দেশই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা দেখাতে চায়।

কিন্তু এখানে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশ দেশই ভারতের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও বাস্তব কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রাখে। নেপালের ক্ষেত্রে সমস্যাটি হলো—অতিরিক্ত প্রতীকী রাজনীতি।

একজন বিদেশসচিবের সফরকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল যেন এটি কোনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম! অথচ বাস্তবে এটি ছিল একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রচেষ্টা।

নেপালের রাজনৈতিক নেতৃত্ব হয়তো ভেবেছে যে ভারতের প্রতিনিধিকে অপেক্ষায় রেখে তারা নিজেদের ‘সার্বভৌম শক্তি’ প্রদর্শন করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বারবার এমন আচরণ একটি দেশের পরিপক্বতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।


ভারত কি কঠোর হবে?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ভারত কি ভবিষ্যতে নেপালের প্রতি আরও কঠোর অবস্থান নেবে?

সম্ভবত প্রকাশ্যে নয়। কারণ দিল্লি জানে, নেপালকে সম্পূর্ণভাবে দূরে ঠেলে দিলে সেটি চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করবে। তবে ভারত ধীরে ধীরে “লেনদেনভিত্তিক” সম্পর্কের দিকে যেতে পারে। অর্থাৎ—

  • যেসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা ভারতের স্বার্থে, সেগুলো চলবে
  • কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া কমে যেতে পারে
  • কূটনৈতিক গুরুত্বের মাত্রা পুনর্মূল্যায়ন হতে পারে
  • এবং নেপালের নেতৃত্বকে আরও বাস্তববাদী হওয়ার জন্য সময় দেওয়া হতে পারে

ভারতের নীতিনির্ধারকরা এটাও বুঝতে পারেন যে নেপালের বর্তমান উত্তেজনা অনেকটাই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফল। ফলে দিল্লি হয়তো অপেক্ষা করবে পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়ার জন্য।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যদি নেপাল নিয়মিতভাবে ভারতবিরোধী প্রতীকী রাজনীতি চালিয়ে যায়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়বে। আর তার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হবে নেপালেরই।


সাধারণ নেপালি জনগণ কী চায়?

রাজনৈতিক বক্তব্য আর সাধারণ মানুষের বাস্তব চাহিদার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ নেপালি জনগণ চায়—

  • কর্মসংস্থান
  • স্থিতিশীল অর্থনীতি
  • পর্যটন বৃদ্ধি
  • উন্নত অবকাঠামো
  • সহজ সীমান্ত যোগাযোগ
  • এবং বিদেশে কাজের সুযোগ

এই সব ক্ষেত্রেই ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাজনৈতিক নেতারা যতই উচ্চস্বরে জাতীয়তাবাদী বক্তব্য দিন না কেন, বাস্তবে সাধারণ মানুষ ভারত-নেপাল সম্পর্ক খারাপ হোক তা চায় না।

কারণ তারা জানে—দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হলে তার প্রভাব পড়বে বাজারে, জ্বালানিতে, চাকরিতে, ব্যবসায় এবং দৈনন্দিন জীবনে।

তাই নেপালের নেতৃত্ব যদি সত্যিই দেশের স্বার্থ চায়, তাহলে তাদের উচিত হবে বাস্তববাদী কূটনীতি করা, অহংকারের প্রদর্শনী নয়।


উপসংহার

বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রির সফর স্থগিত হওয়ার ঘটনা হয়তো পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সংকট নয়, কিন্তু এটি ভারত-নেপাল সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্টভাবে সামনে এনে দিয়েছে। নেপালের নতুন নেতৃত্ব ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চাইছে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় তারা অনেক সময় বাস্তব শক্তির ভারসাম্য ভুলে যাচ্ছে।

জাতীয় মর্যাদা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাতীয় মর্যাদা মানে অকারণে প্রতিবেশী শক্তিকে উস্কানি দেওয়া নয়। বিশেষ করে যখন সেই প্রতিবেশী দেশের উপর আপনার অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

বালেন সরকারের বর্তমান অবস্থান অনেকটাই এমন—যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের করতালিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিকল্প মনে করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব পৃথিবীতে কূটনীতি চলে ধৈর্য, ভারসাম্য, স্বার্থ ও বাস্তববাদ দিয়ে।

ভারতও বুঝে গেছে যে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সংযম জরুরি। তাই দিল্লি আপাতত নীরব ও কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু নেপালেরও বুঝতে হবে—বারবার প্রতীকী সংঘাত তৈরি করে আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়ে না। বরং একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয় আসে স্থিরতা, পরিণত আচরণ এবং বাস্তবসম্মত কূটনীতির মাধ্যমে।

শেষ পর্যন্ত ভূগোলই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। ভারত ও নেপাল চাইলেও একে অপরকে এড়িয়ে যেতে পারবে না। তাই ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—দুই দেশ আবেগের রাজনীতি ছেড়ে বাস্তব সহযোগিতার পথে ফিরতে পারে কি না। আর নেপালের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—তারা কি কৌশলগত বাস্তববাদ বেছে নেবে, নাকি ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক করতালির জন্য নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব বাড়াবে?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যদি আপনার কোনও বিষয়ে ডাউট থাকে বা কোনও বিষয় suggest করতে চান তাহলে মেল করুন!

নবীনতর পূর্বতন

banglafacts 4