পাকিস্তানের কৌশলগত ভাঙন: সামরিক ভাষা বনাম ভয়াবহ বাস্তবতা (২০২৬)

dg-ispr-rhetoric-political-cartoon
Pakistan Strategic Crisis Political Cartoon

পাকিস্তানের বর্তমান কৌশলগত অবস্থান এক গভীর বৈপরীত্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সরকার ও সেনাবাহিনী শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও “হার্ড স্টেট” হওয়ার কথা বলছে। অন্যদিকে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা—অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ভেঙে পড়ছে, সন্ত্রাস বেড়েই চলেছে, অর্থনীতি চরম চাপে, আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তান ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র DG ISPR লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরীর একটি বক্তব্যে—
“মজা না পেলে টাকা ফেরত।”

এই কথা কোনও পর্যটন প্রচার নয়। এটি ছিল ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে করা এক ধরনের হুমকি, যা সেনাবাহিনীর মতো একটি প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্রের কাছে সম্পূর্ণ অপেশাদার, অশোভন ও অবিশ্বাসযোগ্য ভাষা। এই একটি বাক্যই প্রকাশ করে দেয়—পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠান আজ কৌশলগত আত্মবিশ্বাসে নয়, বরং গভীর হতাশা ও চাপের মধ্যে কথা বলছে।


বক্তব্য বনাম বাস্তবতা: পাকিস্তানের দ্বৈত ভাষা

পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র আজ দুটি বিপরীত গল্প বলছে।

১) অর্থনৈতিক আশাবাদের গল্প

সরকার বলছে, পর্যটনই পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ।
প্রধানমন্ত্রীর পর্যটন সমন্বয়ক সর্দার ইয়াসির ইলিয়াস ঘোষণা করেছেন—

  • বছরে ৩০–৪০ বিলিয়ন ডলার পর্যটন আয়

  • বিশ্বজুড়ে প্রচার অভিযান

  • স্লোগান: “Pakistan: Where Beauty Greets, History Speaks, and Adventure Leaves.”

এই ভাষায় পাকিস্তান নিজেকে তুলে ধরছে এক শান্তিপূর্ণ, সুন্দর ও নিরাপদ দেশ হিসেবে।

২) সামরিক আগ্রাসনের গল্প

অন্যদিকে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলছেন—

  • “মজা না পেলে টাকা ফেরত”

  • “ভারত যদি পানি বন্ধ করে, আমরা শ্বাস বন্ধ করব”

  • ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়া নাকি RAW চালায়

এই ভাষা কোনও পেশাদার সামরিক কূটনৈতিক ভাষা নয়। এটি রাস্তার ভাষা। এটি হুমকি নয়, বরং হতাশার বহিঃপ্রকাশ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এই বক্তব্যটি আসে ঠিক তখনই, যখন চীন নাকি CPEC নিয়ে পাকিস্তানের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ, ভিতরের ব্যর্থতা ঢাকতেই বাইরের শত্রু দেখিয়ে উত্তেজনা তৈরি।


ভেঙে পড়া নিরাপত্তা বাস্তবতা: পাকিস্তানের সবচেয়ে রক্তাক্ত বছর

২০২৫ সাল পাকিস্তানের জন্য ছিল গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে রক্তাক্ত বছর।

ভয়াবহ পরিসংখ্যান

  • মোট নিহত: প্রায় ৩,৪১৩ জন (২০২৪ থেকে ৭৪% বেশি)

  • সন্ত্রাসী হামলা: ৬৯৯টি (৩৪% বৃদ্ধি)

  • নিরাপত্তা বাহিনীর মৃত্যু: ৬৬৭ জন (২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ)

  • সাধারণ মানুষের মৃত্যু: ৫৮০ জন

  • আত্মঘাতী হামলা: ২৬টি (৫৩% বৃদ্ধি)

এর মধ্যে ৯৫% হামলা হয়েছে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে।

অর্থাৎ, পাকিস্তানের যেসব এলাকাকে পর্যটনের স্বর্গ বলা হচ্ছে, সেগুলোই সবচেয়ে বিপজ্জনক।


সন্ত্রাস দমনের পরেও কেন ব্যর্থতা?

পাকিস্তান সেনাবাহিনী দাবি করছে তারা ২০২৫ সালে—

  • ৭৫,১৭৫টি গোয়েন্দা অভিযান চালিয়েছে

  • প্রতিদিন গড়ে ২০৬টি অপারেশন

  • ১,৮৭৩ থেকে ২,১৩৮ জন জঙ্গি নিহত

তবুও—

  • হামলা বেড়েছে

  • সেনা মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে

  • রাজধানী ইসলামাবাদেও বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে

এটি স্পষ্ট করে যে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ দমন করতে পারছে না, কেবল ম্যানেজ করছে।


TTP ও আফগান সীমান্ত: নিয়ন্ত্রণের বাইরে বাস্তবতা

এই সংকটের মূল চালিকা শক্তি হলো তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP)

  • তারা আফগানিস্তান থেকে কাজ করছে

  • তালিবান সরকার তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কিছুই করছে না

  • ২০২১ সালে ফেলে যাওয়া মার্কিন অস্ত্র এখন তাদের হাতে

২০২৫ সালের শেষদিকে বড় হামলার মধ্যে ছিল—

  • দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে ক্যাডেট কলেজে আক্রমণ

  • ইসলামাবাদের আদালতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ

পাকিস্তান কার্যত নিজের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ।


সীমান্ত সংকট: আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে একসাথে উত্তেজনা

আফগানিস্তান ফ্রন্ট

২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে—

  • পাকিস্তান আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালায়

  • আফগানিস্তান পাল্টা হামলা করে

  • সব সীমান্ত বন্ধ

  • বাণিজ্য ও মানবিক করিডর স্থবির

আফগানিস্তান পাকিস্তানের সাহায্য নিতে অস্বীকার করে। এটি পাকিস্তানের কূটনীতির জন্য চরম অপমান।

ভারত ফ্রন্ট

মে ২০২৫—

  • ভারত অপারেশন সিন্দুর চালায়

  • একাধিক দিন ধরে স্ট্রাইক

  • পাকিস্তান পারমাণবিক হুমকি দেয়

  • UN নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠক

দক্ষিণ এশিয়া কাগজে নয়, বাস্তবে যুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।


পর্যটন স্বপ্ন বনাম ঋণের বাস্তবতা

পাকিস্তানের পর্যটন প্রচার আসলে আশাবাদ নয়, অর্থনৈতিক বাঁচার চেষ্টা।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা

  • মোট ঋণ: PKR 76 ট্রিলিয়ন (প্রায় $267 বিলিয়ন)

  • GDP-র প্রায় ৬৫% ঋণ

  • ২৪ বার IMF প্রোগ্রাম

  • বিনিয়োগ-GDP অনুপাত: ১৩%-এর নিচে (রেকর্ড কম)

পর্যটনের প্রকৃত অবস্থা

  • ২০২৪ সালে বিদেশি পর্যটক: ৯.৬৫ লক্ষ

  • আয়: মাত্র $738 মিলিয়ন

  • GDP-তে অবদান: ১.৯%

  • কর্মসংস্থানে: ১.৭%

এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে—পর্যটন পাকিস্তানের অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে পারবে না।


নিরাপত্তাহীন দেশে পর্যটন সম্ভব?

যেখানে—

  • ৭১% হামলা পর্যটন অঞ্চলে

  • বিদেশিরা লক্ষ্যবস্তু

  • আদালত ও সেনা ঘাঁটি নিরাপদ নয়

সেখানে “অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম” কেবল কাগজে সুন্দর।

কোনও স্লোগান বুলেট ঠেকাতে পারে না।


সামরিক যোগাযোগের পেশাদারিত্বের পতন

DG ISPR আহমেদ শরীফ চৌধুরীর আচরণ—

  • সাংবাদিককে চোখ মারা

  • রাজনৈতিক নেতাকে “মানসিক রোগী” বলা

  • রাস্তাঘাটের ভাষায় হুমকি

এসব কোনও শক্ত রাষ্ট্রের ভাষা নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষা আত্মবিশ্বাসের নয়—ভয়ের ভাষা।

পেশাদার সেনাবাহিনী সংকেত দেয় কৌশলে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আজ সংকেত দিচ্ছে আবেগে।


“হার্ড স্টেট” — বাস্তবতা না বিভ্রম?

“হার্ড স্টেট” মানে—

  • শক্ত অর্থনীতি

  • কার্যকর কূটনীতি

  • স্থিতিশীল নিরাপত্তা

  • প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা

পাকিস্তানের বাস্তবতা—

  • ঋণে ডুবে

  • সীমান্ত বন্ধ

  • সন্ত্রাস বাড়ছে

  • IMF-নির্ভর

  • অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ

এটি হার্ড স্টেট নয়। এটি চাপের নিচে থাকা রাষ্ট্র।


সামরিক আধিপত্যই দুর্বলতার মূল

১৯৫৮ সাল থেকে পাকিস্তানে সেনাবাহিনী রাজনীতির নিয়ন্ত্রক। এই দীর্ঘ শাসন—

  • জঙ্গি গোষ্ঠী তৈরি করেছে

  • গণতন্ত্র দুর্বল করেছে

  • অর্থনীতি বিকল করেছে

আজ সেই ব্যবস্থাই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা।

৭৫ হাজার অপারেশন করেও যখন নিরাপত্তা বাড়ে না, তখন বোঝা যায়—সমস্যা বন্দুকে নয়, রাষ্ট্রের কাঠামোতে।


প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন

একদিকে পর্যটন অফিস সুন্দর স্লোগান বানাচ্ছে।
অন্যদিকে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাস্তার ভাষায় কথা বলছে।

এর মানে—

  • কোনও জাতীয় কৌশল নেই

  • কোনও সমন্বয় নেই

  • কোনও বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব নেই

রাষ্ট্র আজ নিজেই নিজের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত।


উপসংহার

“মজা না পেলে টাকা ফেরত”—এই কথা শক্তির নয়, হতাশার দলিল।

এটি দেখায়—

  • পাকিস্তান আজ কৌশল হারিয়েছে

  • নিরাপত্তা হারিয়েছে

  • বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে

যখন একটি সেনাবাহিনী হুমকির বদলে ঠাট্টা ব্যবহার করে, তখন বোঝা যায়—তার হাতে বাস্তব শক্তি কমে গেছে।

পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি এক ঐতিহাসিক সংকটের প্রতিফলন, যেখানে রাষ্ট্র নিজেই নিজের দুর্বলতা ঢাকতে শব্দের আশ্রয় নিচ্ছে।

এটি আগ্রাসনের ভাষা নয়।
এটি একটি চাপগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের আর্তনাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যদি আপনার কোনও বিষয়ে ডাউট থাকে বা কোনও বিষয় suggest করতে চান তাহলে মেল করুন!

নবীনতর পূর্বতন

banglafacts 4