ভূমিকা
ইসরায়েলের জন্য ২৫টি উন্নত F-15IA যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ৮.৬ বিলিয়ন ডলারের অনুমোদন সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। এই চুক্তি শুধু অস্ত্র কেনাবেচার বিষয় নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ আকাশযুদ্ধের রণকৌশল—সব কিছুর সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িত।
The F-15IA deal is an $8.6 billion U.S.–Israel defense contract for 25 advanced fighter jets designed to enhance Israel’s long-range strike and air superiority capabilities.
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, Boeing কোম্পানিকে এই চুক্তি দেওয়া হয়েছে। চুক্তিটি ঘোষণা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu-এর ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পরপরই।
এই রিপোর্টের লক্ষ্য হলো—
-
চুক্তিটির সত্যতা যাচাই
-
এর সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্ব ব্যাখ্যা
-
ইসরায়েলের বিমান বাহিনীর ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ
-
সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা
চুক্তির মূল তথ্য ও সত্যতা যাচাই
পেন্টাগনের ঘোষণার ভিত্তিতে বলা যায়, এই চুক্তির প্রধান তথ্যগুলো পুরোপুরি সত্য এবং যাচাইযোগ্য।
চুক্তির প্রধান দিকগুলো
-
মোট মূল্য: ৮.৬ বিলিয়ন ডলার
-
যুদ্ধবিমান সংখ্যা: ২৫টি F-15IA
-
অতিরিক্ত অপশন: ভবিষ্যতে আরও ২৫টি কেনার সুযোগ
-
প্রস্তুতকারক: Boeing
-
উৎপাদন স্থান: সেন্ট লুইস, মিসৌরি (যুক্তরাষ্ট্র)
-
চুক্তির মেয়াদ: ৩১ ডিসেম্বর ২০৩৫ পর্যন্ত
-
প্রথম অর্থছাড়: ৮৪০ মিলিয়ন ডলার
-
সরবরাহ শুরু: ২০৩১ সাল
-
প্রতি বছর সরবরাহ: ৪–৬টি বিমান
এই চুক্তির আওতায় শুধু বিমান বানানো নয়—ডিজাইন, পরীক্ষা, প্রযুক্তি সংযোজন, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০২৪ বনাম ২০২৫: কেন দাম বেড়েছে?
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২৫টি F-15IA কেনার জন্য প্রায় ৫.২ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছিল। তাহলে এক বছরের মধ্যে দাম বেড়ে ৮.৬ বিলিয়ন ডলার হলো কেন?
এর পেছনে কয়েকটি স্পষ্ট কারণ রয়েছে:
-
অতিরিক্ত ২৫টি বিমানের কাঠামো
নতুন চুক্তিতে ভবিষ্যতের আরও ২৫টি বিমানের জন্য প্রযুক্তিগত ও আইনি কাঠামো যুক্ত করা হয়েছে। -
উন্নত ইসরায়েলি প্রযুক্তি সংযোজন
ইসরায়েলের নিজস্ব ইলেকট্রনিক সিস্টেম, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা প্রযুক্তি যোগ করার খরচ বেড়েছে। -
দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণ
প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং সফটওয়্যার আপডেটও মূল চুক্তির অংশ। -
ট্রাম্প প্রশাসনের একীভূতকরণ সিদ্ধান্ত
বাইডেন প্রশাসনের সময় প্রাথমিক অনুমোদন হলেও, ট্রাম্প প্রশাসন সবকিছু এক বড় চুক্তিতে নিয়ে আসে।
F-15IA কী?
F-15IA হলো মূলত F-15EX যুদ্ধবিমানের একটি ইসরায়েল-নির্দিষ্ট সংস্করণ। F-15 সিরিজের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে। বহু বছর ধরে এটি বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ভারী যুদ্ধবিমান হিসেবে পরিচিত।
কেন ইসরায়েল আবার F-15 বেছে নিল?
অনেকে প্রশ্ন করেন—যখন ইসরায়েলের কাছে F-35-এর মতো স্টেলথ বিমান আছে, তখন আবার পুরনো F-15 কেন?
উত্তরটি খুব বাস্তব:
-
F-35 খুব গোপনে ঢুকে আঘাত করতে পারে
-
কিন্তু একসঙ্গে অনেক ভারী অস্ত্র বহন করতে পারে না
-
দীর্ঘ সময় আকাশে থাকতে পারে না
F-15IA এই সীমাবদ্ধতাগুলো পূরণ করে।
F-15IA-এর প্রধান সামরিক সক্ষমতা
ইঞ্জিন ও গতি
-
দুটি শক্তিশালী জেট ইঞ্জিন
-
মোট শক্তি: ৮১,০০০ পাউন্ড থ্রাস্ট
-
সর্বোচ্চ গতি: ম্যাক ২.৫
-
সর্বোচ্চ উচ্চতা: ৫০,০০০ ফুট
পাল্লা ও বহনক্ষমতা
-
যুদ্ধ পরিসর: ১,৩০০ কিলোমিটারের বেশি
-
অস্ত্র বহন ক্ষমতা: ১৪ টন
-
মোট হার্ডপয়েন্ট: ২৪টি
-
একসঙ্গে ২৪টি আকাশযুদ্ধের মিসাইল বহনের সক্ষমতা
এটি F-35-এর তুলনায় অনেক বেশি অস্ত্র বহন করতে পারে।
আধুনিক সেন্সর ও আত্মরক্ষা ব্যবস্থা
F-15IA-তে রয়েছে:
-
উন্নত AESA রাডার
-
একসঙ্গে বহু লক্ষ্য শনাক্ত করার ক্ষমতা
-
শক্তিশালী ইলেকট্রনিক আত্মরক্ষা ব্যবস্থা
-
ডিজিটাল ককপিট ও উন্নত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
এই সবকিছু পাইলটকে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
ইসরায়েলের যুদ্ধনীতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা
অপারেশন “রাইজিং লায়ন” – জুন ২০২৫
এই অভিযানে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক ঘাঁটিতে বড় আকারের আকাশ হামলা চালায়।
-
২০০+ যুদ্ধবিমান
-
৫টি ধাপে আক্রমণ
-
৩৩০+ অস্ত্র নিক্ষেপ
-
১০০টির বেশি লক্ষ্য
এই অভিযানে দেখা যায়—
-
F-35 শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা দুর্বল করে
-
F-15 ভারী অস্ত্র নিয়ে মূল আঘাত হানে
এই দুই ধরনের বিমানের যৌথ ব্যবহারই ইসরায়েলের মূল কৌশল।
সিরিয়া ও অন্যান্য ফ্রন্টে অভিজ্ঞতা
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় “অপারেশন বাশান অ্যারো”-তে—
-
৩৫০টি যুদ্ধবিমান
-
৩৫০+ হামলা
এতে প্রমাণ হয়, দীর্ঘ সময় ধরে ভারী হামলার জন্য বড় আকারের যুদ্ধবিমান অপরিহার্য।
ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর কাঠামোতে পরিবর্তন
বর্তমানে ইসরায়েলের কাছে আছে:
-
F-15: প্রায় ৬৬টি
-
F-16: প্রায় ১৭৪টি
-
F-35: প্রায় ৪০টি
যদি সব মিলিয়ে ৫০টি F-15IA যুক্ত হয়, তাহলে—
-
মোট F-15 হবে ১১৬টি
-
ভারী আঘাত হানার ক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হবে
এটি ইসরায়েলকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য আরও প্রস্তুত করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের “Qualitative Military Edge” নীতি
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বলা আছে—ইসরায়েলকে সবসময় তার প্রতিবেশীদের তুলনায় সামরিকভাবে এগিয়ে রাখতে হবে।
এই নীতিকেই বলা হয় QME।
পেন্টাগন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—
এই চুক্তি ইসরায়েলের দীর্ঘপাল্লার আক্রমণ ক্ষমতা বাড়াবে এবং QME বজায় রাখবে।
সৌদি আরব প্রসঙ্গ ও রাজনৈতিক বার্তা
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে উন্নত F-35 বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইসরায়েল প্রথমে আপত্তি করলেও পরে জানায়—
তারা নিজেদের প্রযুক্তিগত সুবিধা ধরে রাখতে পারবে।
F-15IA + F-35 + নিজস্ব প্রযুক্তি = ইসরায়েলের আত্মবিশ্বাস।
সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ
এই চুক্তির কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতাও আছে।
গোয়েন্দা সহায়তা
দূরপাল্লার হামলার জন্য দরকার—
-
উপগ্রহ ছবি
-
নজরদারি বিমান
-
সিগন্যাল গোয়েন্দা
এই ব্যবস্থা ছাড়া F-15IA পুরো ক্ষমতা দেখাতে পারবে না।
ইলেকট্রনিক যুদ্ধ
শুধু আত্মরক্ষা নয়,
শত্রুর রাডার অচল করাও জরুরি।
এর জন্য আলাদা সহায়ক বিমান ও কৌশল দরকার।
অস্ত্রের জোগান
১৪ টন অস্ত্র বহনের মানে—
-
বিপুল গোলাবারুদ দরকার
-
নিয়মিত উৎপাদন ও আমদানি দরকার
দীর্ঘ যুদ্ধ হলে এটি বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
আকাশে জ্বালানি ভরার সীমাবদ্ধতা
ইসরায়েলের ট্যাঙ্কার বিমানের সংখ্যা সীমিত।
একসঙ্গে বহু ফ্রন্টে যুদ্ধ হলে সমস্যা হতে পারে।
উৎপাদন সময়সূচি ও আর্থিক বাস্তবতা
-
সরবরাহ: ২০৩১–২০৩৫
-
ধীরে ধীরে নতুন বিমান যুক্ত হবে
-
পুরনো F-15 ধাপে ধাপে সরানো হবে
প্রতি বিমানের গড় খরচ প্রায় ৩৪৪ মিলিয়ন ডলার,
যা অন্যান্য উন্নত যুদ্ধবিমানের সঙ্গে তুলনীয়।
উপসংহার
৮.৬ বিলিয়ন ডলারের F-15IA চুক্তি ইসরায়েলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বাস্তববাদী সামরিক উন্নয়ন।
এটি—
-
ইসরায়েলের আকাশ শক্তি বাড়ায়
-
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন দেখায়
-
২০২৫ সালের যুদ্ধ অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ
তবে এটি কোনো “হঠাৎ বিপ্লব” নয়।
এটি পরীক্ষিত প্রযুক্তির উন্নত রূপ।
এর আসল শক্তি থাকবে—
সহায়ক ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য, জ্বালানি, অস্ত্র এবং কৌশলের ওপর।
সব মিলিয়ে বলা যায়,
F-15IA ইসরায়েলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বিনিয়োগ,
যার ফলাফল পুরোপুরি নির্ভর করবে বাস্তব যুদ্ধপরিকল্পনা ও সহায়ক কাঠামোর ওপর।