ভূমিকা
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে একটি নতুন আইন প্রস্তাবিত হয়—"Sanctioning Russia Act of 2025"। এটি সিনেটে S.1241 ও হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে H.R.2548 নম্বরে জমা পড়ে। এই বিলটির মূল লক্ষ্য হলো রাশিয়ার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে তাকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করা এবং যেসব দেশ ও প্রতিষ্ঠান এই যুদ্ধকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া।
বিপুল দ্বিদলীয় সমর্থনের মাধ্যমে প্রস্তাবিত এই বিল মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, বৈশ্বিক কূটনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
বিলের মূল উদ্দেশ্য
"Sanctioning Russia Act"–এর মূল উদ্দেশ্য হলো:
- রাশিয়াকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন বন্ধে বাধ্য করা।
- রাশিয়ার অর্থনীতিকে দুর্বল করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা হ্রাস করা।
- তৃতীয় দেশগুলিকে (যেমন ভারত, চীন, তুরস্ক প্রভৃতি) রাশিয়ার জ্বালানি ও পণ্য আমদানি থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করা।
- বৈশ্বিকভাবে এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যা রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন ও নিরুৎসাহিত করবে।
গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও প্রস্তাব
এই বিলের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য ধারা ও প্রস্তাব রয়েছে যা বৈশ্বিক রাজনীতিকে আমূল প্রভাবিত করতে পারে। নিচে তার বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
১. রাশিয়ান সম্পদের জব্দ ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা
- রাশিয়ার ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সম্পদ জব্দ।
- Central Bank of Russia, Sberbank, Gazprombank–এর মতো বৃহৎ ব্যাংকগুলোর ওপর আর্থিক লেনদেন নিষিদ্ধ।
- রাশিয়ার শেয়ার মার্কেটের সাথে যুক্ত যেকোনো সংস্থার ইউএস স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তি নিষিদ্ধ।
২. রপ্তানি ও বিনিয়োগে কড়াকড়ি
- আমেরিকার কোম্পানিগুলির রাশিয়ায় জ্বালানি সংক্রান্ত বিনিয়োগ নিষিদ্ধ।
- রাশিয়ায় প্রযুক্তি, জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানি বন্ধ।
৩. সেকেন্ডারি স্যাংশন বা গৌণ নিষেধাজ্ঞা
- এই অংশটি সবচেয়ে বিতর্কিত।
- যেসব বিদেশি কোম্পানি বা দেশ রাশিয়ান তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম বা পেট্রোকেমিক্যাল কিনছে বা রপ্তানি করছে, তাদের ওপর ৫০০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব রয়েছে।
- এর লক্ষ্য হলো ভারত, চীন, তুরস্কের মতো দেশ যারা রাশিয়ার জ্বালানির বড় বাজার।
৪. ইউরেনিয়াম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা
- বিলের ধারা ১৪ অনুযায়ী, রাশিয়া বা তার কোনও মিত্র দেশের কাছ থেকে ইউরেনিয়াম আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে।
৫. CAATSA-র পুনরায় সক্রিয়করণ
- "Countering America's Adversaries Through Sanctions Act" (CAATSA)–এর অধীনে রাশিয়ার ওপর আগের নিষেধাজ্ঞাগুলির পূর্ণ বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কংগ্রেসে অবস্থা ও সমর্থন
এই বিলটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্বিদলীয় সমর্থন। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এবং ডেমোক্র্যাট সদস্যরা একত্রে বিলটি নিয়ে আসেন। সিনেটে ইতিমধ্যেই ৮০ জনেরও বেশি কনসারভেটিভ ও লিবারাল কো-স্পনসর রয়েছেন, যার অর্থ, এটি প্রেসিডেন্টের ভেটো হলেও পাশ হয়ে যেতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি এই বিলটিকে সমর্থন করতে পারেন, এবং যদি ৫০ দিনের মধ্যে শান্তিচুক্তি না হয়, তবে "১০০% সেকেন্ডারি ট্যারিফ" আরোপ করবেন রাশিয়ার ওপর।
ভারতের ওপর প্রভাব
ভারত বর্তমানে রাশিয়ার তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ভারত বেশ সস্তায় রাশিয়ার তেল আমদানি করে তার রিজার্ভ বাড়িয়েছে এবং জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। কিন্তু এই নতুন বিল ভারতকে কয়েকটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলে দিয়েছে।
🇮🇳 সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ:
- ৫০০% শুল্ক আরোপ: আমেরিকা যদি ভারতের ওপর এই উচ্চ ট্যারিফ বসায়, তবে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যিক সম্পর্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
- কূটনৈতিক চাপ: আমেরিকা ভারতের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে।
- জ্বালানি নিরাপত্তা: ভারত বিকল্প তেল সরবরাহকারী খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা থাকলে।
🇮🇳 ভারতের সম্ভাব্য জবাব:
- রাশিয়ার সাথে রুপি-রুবল চুক্তি চালিয়ে যাওয়া।
- চীনের সাথে যৌথ মঞ্চে মার্কিন ট্যারিফের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
- বিকল্প বাজার ও প্রযুক্তি খুঁজে বের করে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানো।
চীনের প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব
চীন রাশিয়ার বড় অস্ত্র ও জ্বালানি ক্রেতা এবং উভয়ের মধ্যে "no limits partnership" রয়েছে। এই বিলটি চীনের বিরুদ্ধে একটি আর্থিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
🇨🇳 সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া:
- চীন যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফের জবাবে আমেরিকান পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক বসাতে পারে।
- BRICS, SCO–এর মতো সংস্থার মাধ্যমে বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে।
- ইউয়ান ও ডিজিটাল কারেন্সি ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পথ খুঁজবে।
বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কূটনীতির প্রভাব
এই বিলটি শুধু রাশিয়া বা ভারত-চীন সম্পর্ককেই নয়, বরং পুরো বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
- বিশ্বে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাবে যদি রাশিয়ার উপর আরও নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়।
- OPEC-র সদস্য দেশগুলি তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
- ইউরোপীয় দেশগুলি, যারা রাশিয়ার বিকল্প জ্বালানির সন্ধানে আছে, তাদের চাপ বেড়ে যাবে।
- আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলি যারা রাশিয়ার কাছ থেকে সার, গ্যাস ও খাদ্য পায়, তারাও সমস্যায় পড়বে।
সমালোচনা ও বিতর্ক
এই বিল নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে:
- বিশ্বায়নের বিপরীতে একটি অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের হেভি-হ্যান্ডেড পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন।
- এতে উন্নয়নশীল দেশগুলি মার খাবে, বিশেষ করে যারা নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে নিজেদের স্বার্থে রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন করছে।
উপসংহার
"Sanctioning Russia Act of 2025" একটি টেকটোনিক শিফট—যা শুধু রাশিয়া নয়, বরং গ্লোবাল পাওয়ার ব্যালান্সকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এই আইনের বাস্তবায়ন যদি হয়, তবে ভারত, চীন সহ বহু দেশের অর্থনৈতিক কৌশল বদলাতে বাধ্য হবে। এটি কেবলমাত্র যুদ্ধবিরোধী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি জিও-ইকোনমিক যুদ্ধের শুরু হতে পারে।