ভারতের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক এইচডিএফসি ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সাশিধর জগদীশন সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। একদিকে, তাঁর নেতৃত্বে ব্যাংক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, অন্যদিকে, তাঁকে ঘিরে উদ্ভূত একটি আইনি বিতর্ক সমগ্র ব্যাংকিং জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চলুন বিশদভাবে জেনে নেওয়া যাক সাশিধর জগদীশনের কর্মজীবন, অবদান এবং সাম্প্রতিক বিতর্ক নিয়ে বিস্তারিত।
সাশিধর জগদীশন: পরিচয় ও পেশাগত জীবন
সাশিধর জগদীশন (সাধারণভাবে পরিচিত "সাশি") ২০২০ সালের ২৭ অক্টোবর এইচডিএফসি ব্যাংকের এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি আদিত্য পুরির স্থলাভিষিক্ত হন, যিনি প্রায় ২৬ বছর ধরে ব্যাংকটির নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সাশিধর ১৯৯৬ সালে এইচডিএফসি ব্যাংকে ফাইনান্স ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। মাত্র তিন বছরের মধ্যে তিনি বিজনেস হেড - ফাইনান্স পদে উন্নীত হন। ২০০৮ সালে তিনি ব্যাংকের চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার (CFO) পদে নিযুক্ত হন। ২০১৯ সালে তাকে ব্যাংকের "স্ট্র্যাটেজিক চেঞ্জ এজেন্ট" পদে উন্নীত করা হয়, যেখানে তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল লিগ্যাল ও সেক্রেটারিয়াল, মানবসম্পদ, কর্পোরেট কমিউনিকেশন, অবকাঠামো ও প্রশাসন, এবং CSR কার্যক্রম।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সম্মাননা
সাশিধরের শিক্ষাগত পটভূমি বেশ শক্তিশালী:
- মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি।
- ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ ইন্ডিয়া (ICAI) থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট।
- ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ড, যুক্তরাজ্য থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর (Economics of Money, Banking & Finance)।
তিনি ২০১৩-১৪ সালে CNBC TV18 CFO Awards-এ ব্যাংকিং খাতে সেরা CFO হিসেবে এবং ২০১৯ সালে The Financial Express CFO Awards-এ পুনরায় স্বীকৃতি লাভ করেন।
পুনঃনিয়োগ ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI) সম্প্রতি তাঁর পুনঃনিয়োগকে অনুমোদন দিয়েছে এবং তিনি ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকের এমডি ও সিইও হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন। তাঁর নেতৃত্বে ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকিং, ঋণ বিতরণ ও গ্রাহক পরিষেবায় নজরকাড়া অগ্রগতি সাধন করেছে।
সাম্প্রতিক বিতর্ক: লীলাবতী ট্রাস্ট মামলায় জড়িত
সাশিধর জগদীশন এবং এইচডিএফসি ব্যাংকের বিরুদ্ধে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠে এসেছে লীলাবতী কিরতিলাল মেহতা মেডিকেল ট্রাস্ট (Lilavati Kirtilal Mehta Medical Trust) -এর পক্ষ থেকে। এই ট্রাস্ট মুম্বাইয়ের বিখ্যাত লীলাবতী হাসপাতাল পরিচালনা করে।
অভিযোগের বিবরণ
মেহতা পরিবার, যারা ট্রাস্টের মালিক ও নিয়ন্ত্রক, একটি FIR (First Information Report) দায়ের করেছে সাশিধর জগদীশন ও আরও আটজনের বিরুদ্ধে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ট্রাস্টের তহবিল থেকে প্রতারণামূলকভাবে টাকা নেওয়া।
- একজন বর্তমান ট্রাস্টির পিতাকে হয়রানির অভিযোগ।
- দাবি করা হয়েছে, সাশিধর একটি বাজেয়াপ্ত ক্যাশ ডায়েরিতে ২.০৫ কোটি টাকা গ্রহণ করেছেন।
ট্রাস্ট দাবি করেছে, এই অভিযোগের ভিত্তিতে সাশিধর জগদীশনকে অবিলম্বে বরখাস্ত করা হোক এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো হোক। তারা RBI, SEBI ও অর্থমন্ত্রকের হস্তক্ষেপও চেয়েছে।
এইচডিএফসি ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া
এইচডিএফসি ব্যাংক এই অভিযোগগুলিকে "ভিত্তিহীন ও মিথ্যা" বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ব্যাংকের বিবৃতি অনুযায়ী:
- এই অভিযোগগুলি হলো "মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও আইনের অপব্যবহার।"
- এই অভিযোগ তুলেছেন কিছু "দুষ্টচক্র" যারা ব্যাংকের কাছে ২০০১ সালের ঋণদায়ে ডিফল্ট করেছে।
- সংশ্লিষ্ট সংস্থা Splendour Gems Ltd. - এর বিরুদ্ধে ঋণ ফেরতের মামলায় ব্যাংক ২০০৪ সালে Debt Recovery Tribunal থেকে আদায়যোগ্যতা সনদ পেয়েছে। মে ২০২৫ পর্যন্ত বকেয়া পরিমাণ ৬৫.২২ কোটি টাকা।
- এই অভিযোগ মূলত ব্যাংকের পক্ষ থেকে আইনানুগ ঋণ আদায় প্রক্রিয়া বন্ধ করতেই উত্থাপন করা হয়েছে।
বিতর্কের পেছনের প্রকৃত কারণ?
এই মামলার পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো — মেহতা পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। লীলাবতী ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিবারটির মধ্যে দুটি পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। FIR-এর সময়কাল এবং অভিযুক্তদের তালিকা দেখে অনেকে মনে করছেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত কৌশল হতে পারে ব্যাংকের উপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য।
বিশ্লেষণ ও উপসংহার
সাশিধর জগদীশন একজন প্রতিভাবান ব্যাংকার, যিনি গত তিন দশকে ভারতীয় ব্যাংকিং খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তাঁর নেতৃত্বে এইচডিএফসি ব্যাংক আরও বেশি ডিজিটাল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রাহকমুখী হয়ে উঠেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সাম্প্রতিক অভিযোগগুলি ব্যাংকের ভাবমূর্তিতে সাময়িক আঘাত এনেছে।
তবে, যেহেতু বিষয়টি এখন তদন্তাধীন এবং আদালতের হাতে, তাই চূড়ান্ত রায় আসার আগেই কাউকে দোষী বা নির্দোষ বলা উচিত নয়। এটি দেখার বিষয়, ভারতীয় ব্যাংকিং সেক্টর কিভাবে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয় এবং ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যত বড় প্রতিষ্ঠানে কাজই হোক না কেন, বিশ্বাস ও জবাবদিহিতা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। একজন সিইওর ইমেজ যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে তার প্রভাব পুরো প্রতিষ্ঠানের উপর পড়ে। এখন সময় বলে দেবে, এই বিতর্ক সাশিধর জগদীশনের কর্মজীবনে কতটা প্রভাব ফেলবে।