ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ৯টি প্রধান দুর্বলতা – বিশ্লেষণমূলক রিপোর্ট ২০২৫

 

ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা: একটি বিশ্লেষণ

download-4

ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এটি শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন পরিচালনায় সাহায্য করে না, বরং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ, ঋণদান, এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এ ব্যবস্থার কিছু গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে যা এর কার্যকারিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। এই ব্লগে আমরা ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রধান দুর্বলতাগুলো নিয়ে আলোচনা করব।

১. খেলাপি ঋণ (Non-Performing Assets - NPAs): খেলাপি ঋণ হলো এমন ঋণ যেগুলোর সময়মতো পরিশোধ হয় না এবং ৯০ দিনের বেশি সময় পর্যন্ত অপরিশোধিত থাকে। ভারতের ব্যাংকগুলোর, বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে, এনপিএর পরিমাণ অনেক বেশি। এই এনপিএর কারণে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়, নতুন ঋণ প্রদানের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং আর্থিক সংকটের সৃষ্টি হয়। খেলাপি ঋণ কমাতে সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে এটি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

২. দুর্বল মূলধনীকরণ: মূলধন পর্যাপ্ততা ব্যাঙ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। কিছু ছোট ব্যাংক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে ভুগছে, যার ফলে তারা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দুর্বল হয়ে পড়ে। মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (Capital Adequacy Ratio) কম হলে, ব্যাঙ্কের পক্ষে নতুন ঋণ প্রদান এবং আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

৩. কর্পোরেট শাসনব্যবস্থা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: অনেক ব্যাংকে পর্যাপ্ত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কর্পোরেট গভার্ন্যান্সের অভাব দেখা যায়। দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং ঋণ অনুমোদনের সময় অনিয়ম এসব কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ করা হয়, যা পরবর্তীতে এনপিএতে রূপান্তরিত হয়।

৪. গ্রামীণ অঞ্চলে সীমিত ব্যাংকিং পরিষেবা: ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ গ্রামে বসবাস করলেও তাদের একটি বিশাল অংশ এখনও আধুনিক ব্যাংকিং পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, ইন্টারনেট সুবিধার অভাব এবং ব্যাংক শাখার অভাবে তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ব্যাহত হচ্ছে।

৫. প্রযুক্তিগত দুর্বলতা ও সাইবার ঝুঁকি: ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা বৃদ্ধির সাথে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে। কিছু ব্যাংকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি পরিকাঠামোর অভাব এবং সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল, যা গ্রাহকের তথ্য চুরি এবং অর্থ প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ায়।

৬. প্রতিযোগিতার মুখে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক: বেসরকারি ব্যাংক এবং নন-ব্যাংকিং ফিনান্সিয়াল কোম্পানিগুলোর (NBFCs) আধুনিক ও গ্রাহক-কেন্দ্রিক পরিষেবার কারণে তারা বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো আধুনিক প্রযুক্তি এবং সেবার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে, যার ফলে তারা প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে।

৭. মানবসম্পদের ঘাটতি: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের অভাব লক্ষ করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তি এবং নতুন আর্থিক পরিষেবা চালু করতে হলে দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, যা এখনও অনেক ব্যাংকে পর্যাপ্ত নেই।

৮. একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ: সরকার দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী ব্যাংকের সাথে একীভূত করার নীতি গ্রহণ করেছে। যদিও এর উদ্দেশ্য ভালো, তবে এর ফলে কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা, সাংস্কৃতিক সংঘাত এবং খারাপ ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। একীভূতকরণ বাস্তবায়নে সময় এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন।

৯. সরকারি হস্তক্ষেপ: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো প্রায়শই সরকারের প্রভাবের অধীন থাকে, যার ফলে তারা স্বাধীনভাবে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এই হস্তক্ষেপ অনেক সময় আর্থিক সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং পরিচালনায় বিলম্ব ঘটে।

সমাধান ও ভবিষ্যৎ নির্দেশনা: ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থার এই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারের পাশাপাশি রিজার্ভ ব্যাংকও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে:

  • খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য Insolvency and Bankruptcy Code (IBC) কার্যকর করা হয়েছে।
  • ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করতে সরকার recapitalization উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
  • ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।
  • গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাংক পরিষেবা বিস্তারে India Post Payments Bank, Jan Dhan Yojana-এর মতো প্রকল্প চালু করা হয়েছে।
  • ব্যাংক একীভূতকরণের মাধ্যমে বৃহৎ এবং সক্ষম ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে।

উপসংহার: ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা থাকলেও, সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উদ্যোগে তা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নতি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময়োপযোগী সংস্কার, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ, এবং সুশাসনের মাধ্যমে এই দুর্বলতাগুলো দূর করা সম্ভব।

Read More....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যদি আপনার কোনও বিষয়ে ডাউট থাকে বা কোনও বিষয় suggest করতে চান তাহলে মেল করুন!

নবীনতর পূর্বতন

banglafacts 4