Andaman ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান: এক নতুন শক্তি বিপ্লবের দিগন্ত

 Andaman ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান: এক সম্ভাবনার দিগন্ত

ONGC-র গভীর সমুদ্র ড্রিলিং অপারেশন

ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত অন্ডমান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ শুধু পর্যটনের জন্য নয়, আজকের দিনে দেশের শক্তি নিরাপত্তার দিক থেকেও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর থেকে, ভারত সরকার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলি এই অঞ্চলে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত গায়ানার মতো বিশাল আকারের বাণিজ্যিক খনিজ তেলের আবিষ্কার হয়নি, তবুও বিজ্ঞানসম্মত তথ্য এবং সরকারের আত্মবিশ্বাস বলছে—এই এলাকা ভারতের শক্তি ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।

ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা: অন্ডমান সাগরের গহীনে লুকিয়ে থাকা শক্তি

অন্ডমান সাগর বেসিনকে (Andaman Sea Basin) ভূতত্ত্ববিদরা এক উচ্চ সম্ভাবনাময় হাইড্রোকার্বন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা ও সিসমিক ডেটার মাধ্যমে দেখা গেছে যে এই অঞ্চলে পুরু গঠনযুক্ত তলদেশের পলি ও জৈব উপাদানে সমৃদ্ধ স্তর রয়েছে, যা তেল ও গ্যাস গঠনের জন্য আদর্শ পরিবেশ। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, প্রায় ৭০ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেল সমতুল্য সম্পদ এই বেসিনে অজানা অবস্থায় রয়ে গেছে।

তিন দশক পর নতুন উদ্যমে অভিযান শুরু

১৯৫৯ সালে সর্বপ্রথম অন্ডমান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের সূচনা করে ওএনজিসি (ONGC)। যদিও কয়েকটি গ্যাসের ক্ষুদ্র ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কোনো বড় আবিষ্কার তখন হয়নি। এর ফলে ৩০ বছর ধরে এই অঞ্চল প্রায় অনুসন্ধান-বর্জিত ছিল।

কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। ভারত সরকার নতুনভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উৎসাহ প্রদান করে এবং "Open Acreage Licensing Policy (OALP)" এর মাধ্যমে সংস্থাগুলিকে প্রণোদনা দিতে শুরু করে। এর ফলে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস নিগম (ONGC) এবং অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড (OIL) এই দ্বীপাঞ্চলে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করে।

কেন্দ্র সরকারের দৃঢ় সংকল্প

ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি সম্প্রতি একাধিকবার উল্লেখ করেছেন যে অন্ডমান সাগরে একটি "বৃহৎ তেল আবিষ্কার" এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। তিনি এই আবিষ্কারকে গায়ানার বিশাল তেল মজুদের সাথে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, এই সম্ভাব্য আবিষ্কার ভারতের শক্তি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।

সাম্প্রতিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম

OIL-এর কর্মকাণ্ড

অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড ইতিমধ্যে অন্ডমান সাগরে তাদের প্রথম খনন (drilling) সম্পন্ন করেছে এবং আরো দুটি খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এই কার্যক্রমের জন্য তারা “Blackford Dolphin” নামে একটি আধুনিক সেমি-সাবমার্সিবল ড্রিলিং রিগ ব্যবহার করছে।

ONGC-এর উদ্যোগ

অন্যদিকে, ওএনজিসি এই অঞ্চলের আলট্রা-ডিপ ওয়াটার এলাকায় অনুসন্ধান শুরু করেছে। ২০২২-২৫ সময়কালে তারা প্রায় ১৭০০ মিলিয়ন টন তেল ও গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত অনুসন্ধানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। আগামী তিন বছরে তারা ৬টি গভীর সমুদ্রের কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া ২০২৪ অর্থবছরে তারা গত ৩৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক কূপ খননের রেকর্ড গড়েছে, যা তাদের উদ্যম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পরিচায়ক।

অন্ডমান অঞ্চলের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব

একটি বৃহৎ তেল আবিষ্কার শুধুমাত্র ভারতের জাতীয় শক্তি নিরাপত্তার জন্যই নয়, অন্ডমান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও এক বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। এই অঞ্চলে শিল্প বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং সামাজিক পরিষেবার ব্যাপক উন্নতি ঘটবে।

এই আবিষ্কার অন্ডমান দ্বীপপুঞ্জকে শুধুমাত্র একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং একটি কৌশলগত শিল্পাঞ্চলে পরিণত করতে পারে। সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ এবং পানীয় জলের সরবরাহ ব্যবস্থা—সব কিছুর উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

জাতীয় অর্থনীতির উপর প্রভাব

ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে একটি দ্রুত বর্ধনশীল পর্যায়ে রয়েছে এবং সরকার ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য স্থির করেছে। এই ধরনের এক বা একাধিক তেল আবিষ্কার ভারতের আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করে জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে বিদেশী মুদ্রা সাশ্রয় হবে, আর্থিক ঘাটতি কমবে এবং শিল্পক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটবে।

তেলের ওপর নির্ভরশীল অনেক দেশ যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা গায়ানা তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে, ঠিক তেমনভাবেই ভারতও এই আবিষ্কারের মাধ্যমে এক নতুন শিল্প ও রপ্তানিমুখী জ্বালানি অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ দিশা

তবে এই অনুসন্ধানের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। অন্ডমান সাগরের গভীর জল, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার দিকগুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। একইসঙ্গে, স্থানীয় জনজাতি ও বাসিন্দাদের উন্নয়নে যেন প্রকল্পগুলি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকার ইতিমধ্যে পরিবেশ-সহনশীল প্রযুক্তি ব্যবহার এবং স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।


উপসংহার

অন্ডমান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম ভারতের শক্তি নিরাপত্তা, জাতীয় অর্থনীতি এবং কৌশলগত পরিকল্পনার জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এখনও পর্যন্ত বড় কোনো বাণিজ্যিক আবিষ্কার ঘোষণা না হলেও, ভূতাত্ত্বিক তথ্য, সরকার ও সংস্থাগুলির উদ্যোগ এবং মন্ত্রীর আশাবাদী বক্তব্য—সব মিলিয়ে স্পষ্ট, অতি শীঘ্রই এই অঞ্চলে এক বড় আবিষ্কারের সাক্ষী হতে পারে ভারত। এবং সেই মুহূর্তই হতে পারে ভারতের "এনার্জি স্বাধীনতা" অর্জনের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যদি আপনার কোনও বিষয়ে ডাউট থাকে বা কোনও বিষয় suggest করতে চান তাহলে মেল করুন!

নবীনতর পূর্বতন

banglafacts 4