France Considers India’s Pinaka | Europe’s Artillery Crisis Explained

France considers India’s Pinaka rocket system amid Europe artillery crisis

ভূমিকা: একটি অস্ত্র কেনাবেচার চেয়েও বড় গল্প

ফ্রান্সের পক্ষ থেকে ভারতের DRDO-উন্নত Pinaka মাল্টি-ব্যারেল রকেট লঞ্চার ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ নিছক একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির আলোচনা নয়। এটি ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন, ন্যাটোভুক্ত দেশের কাছে ভারতের অস্ত্র-রপ্তানিকারক হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা এবং মার্কিন নির্ভরতা কমানোর ইউরোপীয় প্রয়াস—এই তিনটির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে।
যা প্রথমে ছিল অনুসন্ধানমূলক আলোচনা, তা আজ উন্নত প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের স্তরে পৌঁছেছে। পিনাকাকে দেখা হচ্ছে একটি “ব্রিজ সলিউশন” হিসেবে—যতদিন না ফ্রান্স নিজস্ব সার্বভৌম দীর্ঘপাল্লার রকেট আর্টিলারি ব্যবস্থা পুরোপুরি প্রস্তুত করতে পারে।


ইউরোপের আর্টিলারি সংকট: ফ্রান্সের কৌশলগত বাধ্যবাধকতা

ফ্রান্স এই মুহূর্তে একটি তীব্র সক্ষমতা সংকটের মুখে। ফরাসি সেনাবাহিনীর হাতে রয়েছে মাত্র নয়টি LRU (Lance-Roquettes Unitaire) ব্যবস্থা—যা আসলে মার্কিন M270 MLRS-এর ইউরোপীয় সংস্করণ। এই সিস্টেমগুলির সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৭০ কিলোমিটার এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগুলি আজ কার্যত অপ্রচলিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই LRU সিস্টেমগুলি ২০২৭ সালের মধ্যে অবসর নেওয়ার কথা। অর্থাৎ ফ্রান্সের হাতে বিকল্প বেছে নেওয়ার জন্য সময় খুবই সীমিত।
ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ ইউরোপকে হাতে-নাতে শিখিয়ে দিয়েছে যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে গোলাবারুদ, রকেট আর আর্টিলারি কত দ্রুত ফুরিয়ে যায়। এই বাস্তবতা ফ্রান্সকে বাধ্য করেছে একটি দ্রুত সিদ্ধান্তের পথে হাঁটতে।

ফরাসি সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় €৬০০ মিলিয়ন বরাদ্দ করেছে ১০টি নতুন দীর্ঘপাল্লার আর্টিলারি সিস্টেম কেনার জন্য, এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৩টি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এখানেই মূল সমস্যা—ফ্রান্সের নিজস্ব প্রকল্প FLP-T (Frappe Longue Portée Terrestre) এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। এর প্রথম পরীক্ষামূলক ফায়ারিং নির্ধারিত মধ্য-২০২৬, যা LRU অবসর নেওয়ার সময়সীমার খুব কাছাকাছি।

এই সময়সূচির ফাঁকই পিনাকার জন্য দরজা খুলে দেয়।


পাল্লা ও সক্ষমতার তুলনা: ফ্রান্সের বিকল্পগুলো

ফ্রান্সের সামনে বাস্তবে তিনটি পথ রয়েছে—
১) বিদ্যমান LRU ধরে রাখা (অবাস্তব)
২) মার্কিন HIMARS বা সমজাতীয় ব্যবস্থা কেনা
৩) একটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে পিনাকার মতো সিস্টেম গ্রহণ করা

মার্কিন HIMARS নিঃসন্দেহে কার্যকর, কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত থাকে রাজনৈতিক ও অপারেশনাল শর্ত। ইউক্রেন যুদ্ধে দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ও পাল্লার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। এই “কন্ট্রোল মেকানিজম” ফ্রান্সের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।


পিনাকা: যুদ্ধ-পরীক্ষিত ও খরচ-কার্যকর বিকল্প

ভারতের পিনাকা ব্যবস্থা ফ্রান্সের প্রয়োজনের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়।

পিনাকা Mk-II

  • পাল্লা: ৭৫–৯০ কিমি

  • ৪৪ সেকেন্ডে ১২টি রকেট নিক্ষেপ

  • প্রায় ৭০০×৫০০ মিটার এলাকায় বিধ্বংসী প্রভাব

গাইডেড পিনাকা

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ইউজার ট্রায়ালে এই সংস্করণ ৭৫ কিমি+ পাল্লায় ১০ মিটারের কম CEP (Circular Error Probable) অর্জন করেছে। এই নির্ভুলতা HIMARS-এর মতো সিস্টেমের সমতুল্য—কিন্তু খরচ অনেক কম।

পিনাকা Mk-III

এটাই ফ্রান্সের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় সংস্করণ।

  • ক্যালিবার: ৩০০ মিমি

  • পাল্লা: ১২০ কিমি

  • ওয়ারহেড: প্রায় ২৫০ কেজি

  • উন্নত গাইডেন্স ও ন্যাভিগেশন সিস্টেম (DRDO-এর Research Centre Imarat দ্বারা উন্নত)

এই Mk-III কার্যত ফ্রান্সের বর্তমান LRU এবং ভবিষ্যৎ FLP-T প্রকল্পের মাঝখানের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে। ফরাসি সেনাপ্রধান জেনারেল পিয়ের শিল প্রকাশ্যে এই সংস্করণের প্রতি আগ্রহের কথা স্বীকার করেছেন।


খরচের বাস্তবতা: অর্থনৈতিক যুক্তি

খরচের দিক থেকেও পিনাকা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক।

  • ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়া ২২টি HIMARS কেনে প্রায় $৯৭৫ মিলিয়ন খরচে।

  • ২০২২ সালেই আর্মেনিয়া ৪টি পিনাকা ব্যাটারি কেনে প্রায় $২৫০ মিলিয়ন-এ।

ফ্রান্সের মতো দেশের জন্য, যেখানে বাজেট চাপ ও সময়ের অভাব—এই খরচ-কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


কূটনৈতিক পথচলা: আলোচনা থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব

২০২৪ সালে ফরাসি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্টেফান রিশু ভারতে পিনাকার প্রদর্শনী প্রত্যক্ষ করেন এবং প্রকাশ্যে জানান যে সিস্টেমটি প্রত্যাশা পূরণ করেছে।

২০২৫ সালের শুরুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরাসরি ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ-কে পিনাকার প্রস্তাব দেন। এটি স্পষ্ট করে যে ভারত এই চুক্তিকে কেবল বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না, বরং কৌশলগত সহযোগিতায় রূপ দিতে চায়।

ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ রয়টার্স জানায়, ফ্রান্স পিনাকা কেনার বিষয়ে “advanced talks”-এ রয়েছে। আলোচনায় সহ-উন্নয়ন (co-development), প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং যৌথ উৎপাদনের বিষয়ও উঠে আসে।

এই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত রূপ আসে নভেম্বর ২০২৫-এ, যখন DRDO চেয়ারম্যান ড. সমীর ভি. কামাত এবং ফ্রান্সের DGA প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল গায়েল দিয়াজ দে তুয়েস্তা একটি বিস্তৃত প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এতে ড্রোন, এআই, সাইবার, প্রপালশন, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত।


কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন: ফ্রান্সের দ্বিধা

তবু একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব থেকেই যায়। ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা নীতি দীর্ঘদিন ধরেই strategic autonomy-কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়—যার শিকড় শার্ল দ্য গলের যুগে।

২০২৫ সালের শুরুতে ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি সাময়িকভাবে স্থগিত করার মার্কিন সিদ্ধান্ত ইউরোপে এই ভয় আরও বাড়িয়েছে যে অতিরিক্ত মার্কিন নির্ভরতা বিপজ্জনক।

এই কারণেই ফ্রান্সের নিজস্ব FLP-T প্রকল্প এত গুরুত্বপূর্ণ। Safran–MBDA এবং Thales–ArianeGroup-এর দুটি কনসোর্টিয়াম ১৫০ কিমি (ভবিষ্যতে ৫০০–১০০০ কিমি) পাল্লার ব্যবস্থা তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে।

ফরাসি সামরিক নেতৃত্ব বারবার বলেছে—LRU-এর বিকল্প “sovereign” হতে হবে।


সম্ভাব্য ফলাফল: তিনটি পথ

২০২৬ সালে ফ্রান্সের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তখন তিনটি সম্ভাবনা থাকবে—

  1. FLP-T সফল হলে, পিনাকা বাদ পড়বে।

  2. FLP-T দেরি করলে, পিনাকা interim system হিসেবে আসতে পারে।

  3. সীমিত সংখ্যায় পিনাকা নিয়ে পরীক্ষামূলক ব্যবহার।

ডিসেম্বর ২০২৫-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ফ্রান্স এখনও পিনাকা Mk-III-এর অগ্রগতি “closely tracking” করছে—অর্থাৎ দরজা খোলা আছে, কিন্তু প্রতিশ্রুতি নেই।


ভারতের প্রাপ্তি: আমদানিকারক থেকে রপ্তানিকারক

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যাই হোক, এই আলোচনা নিজেই ভারতের জন্য ঐতিহাসিক।
একসময় বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ আজ ১০০+ দেশে রপ্তানি করছে।

  • ২০১৬: ₹১,৫০০ কোটি

  • FY2025: ₹২৩,৬২২ কোটি

  • লক্ষ্য: ২০২৯-এর মধ্যে ₹৫০,০০০ কোটি ($৬B+)

ফ্রান্সের মতো একটি বড় ন্যাটো শক্তির আগ্রহ ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পকে বৈশ্বিক মানচিত্রে নতুন স্তরে নিয়ে গেছে।


উপসংহার: প্রতিশ্রুতি নয়, কিন্তু দিকনির্দেশ স্পষ্ট

২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে বলা যায়—ফ্রান্স পিনাকাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে, কিন্তু সার্বভৌমতার আশঙ্কা ছাড়েনি। সিদ্ধান্ত এখনও খোলা।
তবু একটি বিষয় নিশ্চিত: ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের অবস্থান বদলে গেছে। পিনাকা আজ শুধু একটি রকেট সিস্টেম নয়—এটি ভারতের কৌশলগত উত্থানের প্রতীক।

ফ্রান্সের সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, এই অধ্যায় প্রমাণ করেছে যে ভারত আর কেবল ক্রেতা নয়—সে এখন বিশ্ব প্রতিরক্ষা বাজারের একজন বিশ্বাসযোগ্য সরবরাহকারী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যদি আপনার কোনও বিষয়ে ডাউট থাকে বা কোনও বিষয় suggest করতে চান তাহলে মেল করুন!

নবীনতর পূর্বতন

banglafacts 4