সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাত ও সামরিক অভিযানের ধারাবাহিকতায় একটি বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—রাশিয়া ও চীনের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা (Air Defense) ব্যবস্থা বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার মুখোমুখি হচ্ছে। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পর মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য এই ব্যর্থতাগুলিকে কেবল প্রযুক্তিগত ইস্যু হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তি প্রদর্শনের অস্ত্র হিসেবেও তুলে ধরছে।
এই প্রবন্ধে তিনটি প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র—
১) ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত (অপারেশন সিন্দুর),
২) ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান,
৩) এবং ইউক্রেন যুদ্ধ (২০২২–২০২৫)
—এই তিন প্রেক্ষাপটে চীনা ও রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি মূল্যায়ন করা হবে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্যকে “পুতিন ও শি জিনপিংকে প্রকাশ্যে উপহাস” বলা কতটা যথার্থ।
১. নথিভুক্ত ব্যর্থতা: যখন বাস্তব যুদ্ধ পরীক্ষাগার হয়ে ওঠে
(ক) অপারেশন সিন্দুর: পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় সম্পূর্ণ বিপর্যয়
(ভারত–পাকিস্তান, মে ২০২৫)
২০২৫ সালের মে মাসে সংঘটিত “অপারেশন সিন্দুর” দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে। এই অভিযানে ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও নিখুঁত অস্ত্র ব্যবহার করে আঘাত হানে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—পাকিস্তানের চীনা সরবরাহকৃত আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক কার্যত অকার্যকর প্রমাণিত হয়।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার মূল স্তম্ভ ছিল চীনের HQ-9 ও HQ-16 এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, যেগুলোকে পশ্চিমা প্যাট্রিয়ট বা SAMP/T-এর বিকল্প হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। বাস্তবে দেখা যায়, এই সিস্টেমগুলো একটি ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্রও সনাক্ত বা প্রতিহত করতে পারেনি।
ভারতীয় বাহিনী বহুস্তরীয় ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার কৌশল প্রয়োগ করে—
• ডিকয় মিসাইল
• রাডার জ্যামিং
• সিগন্যাল সাপ্রেশন
• নেটওয়ার্ক বিভ্রান্তি
এর ফলে পাকিস্তানের ইন্টিগ্রেটেড এয়ার ডিফেন্স গ্রিড কার্যত “অন্ধ” হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, একাধিক HQ-9 ব্যাটারি সরাসরি ধ্বংস হয়, যার মধ্যে মধ্য পাঞ্জাবের চুনিয়ান এয়ার বেসে থাকা চীনা YLC-8E অ্যান্টি-স্টেলথ রাডারও অন্তর্ভুক্ত।
সামরিক বিশ্লেষকরা এই ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন:
• HQ-9-এর সেমি-অ্যাকটিভ রাডার গাইডেন্স প্রযুক্তিগতভাবে জ্যামিং-প্রবণ
• নেটওয়ার্ক ইন্টিগ্রেশন দুর্বল
• অপারেটর ট্রেনিং সীমিত
• আধুনিক ইলেকট্রনিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নেই
চীনা সামরিক ফোরামগুলোতেও এই ঘটনা গভীর আলোড়ন তোলে। একটি বহুল প্রচারিত মন্তব্যে লেখা হয়েছিল:
“যদি ব্রহ্মোস আমাদের ‘লেয়ার্ড শিল্ড’ ভেদ করে নির্বিঘ্নে ঢুকে পড়ে, তাহলে আমরা পাকিস্তানকে আসলে কী বিক্রি করছি?”
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মহলে অসন্তোষ ছড়ায়। তারা যেসব সিস্টেমকে “অ্যাডভান্সড কমপ্রিহেনসিভ সলিউশন” বলে কিনেছিল, বাস্তবে তা আধুনিক আক্রমণের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। এর ফলে আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারে চীনা প্রতিরক্ষা পণ্যের “যুদ্ধ-প্রমাণিত” ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খায়।
(খ) ভেনেজুয়েলা অভিযান: রুশ ও চীনা সিস্টেমের যৌথ ব্যর্থতা
(মার্কিন অভিযান, জানুয়ারি ২০২৬)
২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বিশেষ অভিযানে আরেকটি বড় উদাহরণ দেখা যায়। দেশটির প্রতিরক্ষা কাঠামো গঠিত ছিল রুশ Buk-M2E, S-300, চীনা FK-3 ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং JYL-1 ও JY-27A রাডারের সমন্বয়ে।
চীনা নির্মাতারা দাবি করেছিল, এই রাডারগুলো ৭৫ কিমি দূর থেকেও F-35 স্টেলথ বিমান শনাক্ত করতে সক্ষম। বাস্তবে দেখা যায়, মার্কিন EA-18G Growler ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বিমানের সক্রিয় জ্যামিং শুরু হতেই এই রাডারগুলো কার্যত অন্ধ হয়ে যায়।
রাডার অচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেনেজুয়েলার এয়ার ডিফেন্স ইউনিটগুলোর কমান্ড ও কন্ট্রোল ভেঙে পড়ে। বিচ্ছিন্ন ও বিভ্রান্ত ইউনিটগুলো সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। ফলস্বরূপ, প্রায় ২০০ মার্কিন বিশেষ বাহিনী কারাকাসের কেন্দ্রে কার্যত বাধাহীনভাবে অভিযান চালাতে সক্ষম হয়।
এই ঘটনা শুধু ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, বরং রুশ-চীনা প্রযুক্তির যৌথ অপারেশনাল অক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে আন্তর্জাতিক সামরিক মহলে আলোচিত হয়।
(গ) ইউক্রেন যুদ্ধ: দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয় ও কভারেজ গ্যাপ
(২০২২–২০২৫)
ইউক্রেন যুদ্ধ রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করেছে। S-400 তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে রাশিয়া অসংখ্য রাডার, লঞ্চার ও কমান্ড ইউনিট হারিয়েছে।
ইউক্রেন ধারাবাহিকভাবে রুশ এয়ার ডিফেন্স সাইটে নিখুঁত হামলা চালিয়ে “কভারেজ গ্যাপ” তৈরি করেছে। এর ফলেই রুশ ভূখণ্ডের গভীরে ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
২০২৫ সালেই রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ১৬০টির বেশি সফল হামলা হয়। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়—আকাশ প্রতিরক্ষার স্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হলে কৌশলগত নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে।
২. “মকিং” বনাম “মেসেজিং”: মার্কিন বক্তব্যের প্রকৃত চরিত্র
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ নিউপোর্ট নিউজ শিপইয়ার্ডে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন:
“ওই রুশ এয়ার ডিফেন্সগুলো খুব একটা ভালো কাজ করল না, তাই না?”
তিনি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের “শক্তি, স্পষ্টতা ও নেতৃত্বের” প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই বক্তব্যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ভ্লাদিমির পুতিন বা শি জিনপিংকে আক্রমণ করেননি। তিনি বিদ্রূপ করেছেন সিস্টেমের কার্যকারিতা নিয়ে, নেতাদের নয়। এটি ছিল কূটনৈতিক ভাষায় একটি স্ট্র্যাটেজিক সিগন্যালিং—বন্ধু রাষ্ট্রদের আশ্বস্ত করা ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সতর্ক করা।
অতএব “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে পুতিন ও শি-কে উপহাস করছে” বলা অতিরঞ্জিত। বাস্তবে এটি ছিল প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা।
৩. চীন ও রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া: নীরব ক্ষোভ, প্রকাশ্য সংযম
চীন ও রাশিয়া উভয়ই ভেনেজুয়েলা অভিযানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানায়। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “কোনো দেশই নিজেকে বিশ্বের পুলিশ ভাবতে পারে না।” রুশ রাষ্ট্রদূত একে “মার্কিন আগ্রাসন” বলে আখ্যা দেন।
তবে লক্ষ্যণীয় বিষয়—তারা কোনো সামরিক হুমকি দেয়নি, কিংবা মার্কিন নেতৃত্বকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেনি। এই সংযম নিজেই ইঙ্গিত দেয়, তারা এই পরিস্থিতিতে শক্ত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা রাখে না।
৪. বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রভাব
এই ঘটনাগুলোর প্রভাব বহুমাত্রিক:
• পাকিস্তান বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজছে, তুরস্কের দিকে নজর দিচ্ছে
• চীনের অস্ত্র রপ্তানির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত
• রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষার “অভেদ্যতা” ধারণা ভেঙে পড়েছে
• যুক্তরাষ্ট্র ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক যুদ্ধে স্পষ্ট সুবিধা দেখিয়েছে
• ছোট ও মধ্যম শক্তিগুলো তাদের প্রতিরক্ষা দর্শন পুনর্বিবেচনা করছে
উপসংহার
চীনা ও রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাম্প্রতিক সংঘাতে যে গুরুতর ব্যর্থতা দেখিয়েছে, তা কেবল কৌশলগত নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও বাণিজ্যিক ধাক্কাও। যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যর্থতাকে প্রকাশ্যে তুলে ধরে বৈশ্বিক শক্তি-প্রদর্শনের অংশ করেছে।
তবে এটিকে পুতিন ও শি জিনপিংকে ব্যক্তিগত উপহাস বলা বাস্তবসম্মত নয়। এটি ছিল সিস্টেম-লেভেল সমালোচনা ও ভূরাজনৈতিক বার্তা।
একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধে কেবল ক্ষেপণাস্ত্র নয়—রাডার, নেটওয়ার্ক, সফটওয়্যার ও ইলেকট্রনিক আধিপত্যই নির্ধারণ করছে প্রকৃত ক্ষমতা। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে দিয়েছে, এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সুস্পষ্টভাবে এগিয়ে।