ভারতের ব্রহ্মোস মোকাবেলায় পাকিস্তান কি জার্মানির IRIS-T SLM প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনছে?
বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রতিটি দেশের জন্য নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা একটি অগ্রাধিকার বিষয়। দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়। তবে সম্প্রতি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে – জার্মানির উন্নত মধ্যম পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা IRIS-T SLM কেনার পরিকল্পনা।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ভারতের ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল এবং চীনের তৈরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ। চলুন, এই প্রসঙ্গটি বিশ্লেষণ করি বিস্তারিতভাবে।
🔴 কেন পাকিস্তান জার্মানির IRIS-T SLM কিনতে চাইছে?
প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানের এই আগ্রহের মূল কারণ ভারতের ব্রহ্মোস মিসাইল। বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের একটি গোপন সামরিক অভিযানে – যা “অপারেশন সিন্দুর” নামে পরিচিত – ব্রহ্মোস মিসাইল ব্যবহার করে পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। এই ঘটনায় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে যায়।
চীনের তৈরি HQ-9 ও HQ-16 প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই আক্রমণ ঠেকাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে পাকিস্তান এখন আরও নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণিত প্রযুক্তি খুঁজছে, যার ফলে তাদের নজর পড়েছে জার্মানির IRIS-T SLM এর উপর।
🧨 IRIS-T SLM এর ক্ষমতা ও কার্যকারিতা
IRIS-T SLM হল জার্মানির Diehl Defence কর্তৃক নির্মিত একটি মধ্য-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে, যেখানে এটি রাশিয়ার P-800 Oniks সহ বিভিন্ন ক্রুজ মিসাইল ঠেকাতে সফল হয়। উল্লেখ্য, Oniks এবং ভারতের ব্রহ্মোস প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেকটা কাছাকাছি, কারণ দুটিই সুপারসনিক গতি সম্পন্ন এবং মাটি ঘেঁষে চলাচলে সক্ষম।
IRIS-T SLM এর মূল বৈশিষ্ট্য:
- পরিসীমা: প্রায় ৪০ কিলোমিটার বা ২৫ মাইল
- ৩৬০-ডিগ্রি কভারেজ: একইসাথে বিভিন্ন দিক থেকে আসা হামলা শনাক্ত ও প্রতিরোধে সক্ষম
- উন্নত রাডার ব্যবস্থা ও অপারেশন সেন্টার
- একাধিক লঞ্চার দ্বারা সমন্বিত সিস্টেম
- উপযুক্ত টার্গেট: সুপারসনিক মিসাইল, ফাইটার জেট, ড্রোন ইত্যাদি
এই সিস্টেমের কার্যকারিতা ইউক্রেন যুদ্ধে পরীক্ষিত, ফলে এটি পাকিস্তানের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।
❌ চীনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পাকিস্তানের হতাশা
পাকিস্তানের বর্তমান আকাশ প্রতিরক্ষা প্রধানত চীনের উপর নির্ভরশীল – বিশেষত HQ-9 এবং HQ-16 মিসাইল সিস্টেম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীনা প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাকিস্তানের সামরিক সূত্রে প্রকাশ, চীনা প্রতিরক্ষা সিস্টেম ড্রোন হামলা এবং ক্রুজ মিসাইল শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই ব্যর্থতা পাকিস্তানকে নতুন জোট ও প্রযুক্তির সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করছে। চীনের উপর একচেটিয়া নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে পাকিস্তান এখন পশ্চিমা প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে, বিশেষত ইউরোপীয় সামরিক সিস্টেমগুলোর দিকে।
💰 IRIS-T SLM এর দাম ও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বাস্তবতা
একটি IRIS-T SLM ব্যাটারির দাম প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার – যা পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আন্তর্জাতিক ঋণ বোঝা, এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট এই ধরনের বড় সামরিক চুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। তাই এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে পাকিস্তান প্রাথমিকভাবে সীমিত সংখ্যক ইউনিট কেনার চেষ্টা করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আরও কিনবে যদি পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে।
🌍 ভূরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি
জার্মানির এই সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রয় দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ, জার্মানি ইতিমধ্যেই ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রকল্পে যুক্ত – যেমন, থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (TKMS) ভারতীয় সাবমেরিন প্রকল্পে কাজ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সঙ্গে IRIS-T SLM এর মত উন্নত প্রযুক্তি শেয়ার করলে ভারত এটিকে জার্মানির দ্বিমুখী নীতির প্রমাণ হিসেবে দেখাতে পারে। ভারত এমনটা মনে করতে পারে যে, জার্মানি একদিকে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করছে, অপরদিকে পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তি সরবরাহ করছে।
🇮🇹 বিকল্প অপশন: ইতালির CAMM-ER
জার্মানির IRIS-T SLM এর পাশাপাশি পাকিস্তান ইতালির CAMM-ER (Common Anti-Air Modular Missile – Extended Range) সিস্টেমকেও বিবেচনা করছে। CAMM-ER একটি মডুলার ও এক্সটেন্ডেড রেঞ্জ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, যা তুলনামূলকভাবে সস্তা হতে পারে।
তবে IRIS-T SLM যুদ্ধক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হওয়ায়, সেটিকেই পাকিস্তানের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
🔚 উপসংহার
পাকিস্তান তার প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিচ্ছে। চীনা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে, তারা এখন ইউরোপীয়, বিশেষত জার্মান প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। ভারতের ব্রহ্মোস মিসাইলের মতো উচ্চগতির হুমকি মোকাবেলায় IRIS-T SLM একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই সম্ভাব্য চুক্তি শুধু সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলবে। পাকিস্তান যদি সত্যিই এই সিস্টেম কিনে ফেলে, তবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিরক্ষা ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে এবং ভারত-জার্মানি সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে।
আপনি কি মনে করেন, পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক প্রতিযোগিতা আরও বাড়াবে? মতামত জানান কমেন্টে।