
ভারতের ব্রহ্মোস (BrahMos) ক্ষেপণাস্ত্র বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম এবং সবচেয়ে কার্যকর সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলির মধ্যে একটি। ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
এক ঝলকে ব্রহ্মোস মিসাইলের বিশ্লেষণ:
* উৎপত্তি ও নামকরণ: ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রটি ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে গঠিত BrahMos Aerospace দ্বারা তৈরি হয়েছে। এর নামকরণ করা হয়েছে ভারতের ব্রহ্মপুত্র নদ এবং রাশিয়ার মস্কভা নদীর নামের সমন্বয়ে। ১৯৯৮ সালে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে একটি আন্তঃসরকারি চুক্তির মাধ্যমে BrahMos Aerospace গঠিত হয়।
* বৈশিষ্ট্য:
* গতি: এটি একটি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যা শব্দের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ বেশি গতিতে (প্রায় ২.৮ থেকে ৩ ম্যাক) উড়তে সক্ষম। এই উচ্চ গতির কারণে রাডারে ধরা পড়া এবং একে আটকে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
* বহুমুখী উৎক্ষেপণ: ব্রহ্মোস বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎক্ষেপণ করা যেতে পারে, যেমন -
* ভূমি থেকে: মোবাইল অটোনোমাস লঞ্চার (MAL) থেকে।
* সমুদ্র থেকে: জাহাজ এবং ডুবোজাহাজ থেকে।
* আকাশ থেকে: সুখোই-৩০এমকেআই (Su-30MKI) যুদ্ধবিমান থেকে।
* নির্ভুলতা: এটি 'ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট' প্রযুক্তি ব্যবহার করে, অর্থাৎ একবার লক্ষ্যবস্তু স্থির করে উৎক্ষেপণ করলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। এর নির্ভুলতা এতটাই বেশি যে এটিকে 'হিটাইল' (Hitile) নামেও অভিহিত করা হয়।
* পাল্লা: ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ২৯০ কিমি থেকে ৮০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত (MTCR সদস্য হওয়ার পর এর পাল্লা বৃদ্ধি করা হয়েছে)।
* পে লোড: এটি ২০০ থেকে ৩০০ কেজি প্রচলিত বা পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম।
* বিশেষ ক্ষমতা: এটি সমুদ্রের কয়েক ফুট উপরে উড়তে পারে, যা এটিকে রাডার থেকে আড়াল করতে সাহায্য করে। এটি যেকোনো আবহাওয়ার পরিস্থিতিতে দিন ও রাতে কাজ করতে সক্ষম।
* প্রতিরক্ষায় গুরুত্ব:
* ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তিকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি ভারতের স্থলসেনা, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
* এর উচ্চ গতি, নির্ভুলতা এবং বহুমুখী উৎক্ষেপণের ক্ষমতা এটিকে শত্রুপক্ষের জন্য এক কঠিন প্রতিপক্ষ করে তুলেছে।
* ভারতের 'অপারেশন সিঁদুর'-এর মতো সামরিক অভিযানে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার এর কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।
* রপ্তানি: ভারত ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম দেশগুলিতেও রপ্তানি করছে, যেমন ফিলিপাইন। এটি ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
* ভবিষ্যৎ উন্নয়ন: ব্রহ্মোস-এর হাইপারসনিক সংস্করণ (ব্রহ্মোস-২) এবং ছোট আকারের ব্রহ্মোস-NG (Next Generation) তৈরির কাজ চলছে, যা ভবিষ্যতে তেজসের মতো হালকা যুদ্ধবিমানেও ব্যবহার করা যাবে।
সংক্ষেপে, ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের সামরিক সক্ষমতায় এক যুগান্তকারী সংযোজন। এর উন্নত প্রযুক্তি এবং বহুমুখী ক্ষমতা ভারতকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্তরে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।