🇺🇸 লস অ্যাঞ্জেলেসে মার্কিন সেনা মোতায়েন: অভিবাসন ইস্যুতে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র

লস অ্যাঞ্জেলেসে সেনা মোতায়েন ২০২৫: ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে উত্তাল শহর 

download-29

গত কয়েকদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস শহর অস্থির অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল কারণ—অভিবাসন বিরোধী কঠোর অভিযান ও বর্ধিত ইমিগ্রেশন রেইডের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে হাজার হাজার মানুষ। এবং এই পরিস্থিতির জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেটি করলেন, তা ১৯৯২ সালের পর প্রথম।

২০২৫ সালের ১০ জুন থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে প্রায় ৭০০ মার্কিন মেরিন (US Marines) মোতায়েন শুরু হয়েছে, সাথে আরও ৪,০০০ ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে সক্রিয় করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে তা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে নতুন এক সংঘাতের জন্ম দিয়েছে।


🔥 কী ঘটছে লস অ্যাঞ্জেলেসে?

📅 বিক্ষোভের সূত্রপাত

বিক্ষোভ শুরু হয় ২০২৫ সালের ৬ জুন, শুক্রবার থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (ICE) বেশ কিছু জায়গায় কঠোর ইমিগ্রেশন অভিযান চালায়। এতে অনেক অনথিভুক্ত অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

👥 আন্দোলনের চরিত্র

প্রতিবাদকারীরা মূলত অভিবাসী, শ্রমিক সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ নাগরিক—যারা অভিবাসন নীতির কঠোরতার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন। লস অ্যাঞ্জেলেস ছাড়াও নিউ ইয়র্ক, শিকাগো, সিয়াটল, আটলান্টা সহ আরও কয়েকটি শহরে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে।


🪖 ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত: সেনা মোতায়েন

🇺🇸 ৭০০ মার্কিন মেরিন মোতায়েন

১০ জুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে ৭০০ মার্কিন মেরিন লস অ্যাঞ্জেলেসে মোতায়েন করা হচ্ছে। এর আগে তিনি ২,০০০ ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছিলেন, পরে সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ৪,০০০ করা হয়।

হোয়াইট হাউজের বিবৃতিতে বলা হয়, এই সেনাবাহিনী ফেডারেল সম্পদ ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন করা হয়েছে, বিশেষ করে অভিবাসন কর্মকর্তাদের যারা ইমিগ্রেশন রেইডে অংশ নিচ্ছেন।

🏛️ আইনগত প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ। কারণ সাধারণত কোনও রাজ্যে সেনা বা ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করতে হলে রাজ্যপালের সম্মতি প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসোমের অনুমতি ছাড়াই কেন্দ্র সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে।

এটি ১৯৯২ সালের রডনি কিং রায় পরবর্তী দাঙ্গার পর প্রথম যখন লস অ্যাঞ্জেলেসে মার্কিন মেরিন মোতায়েন করা হলো।


⚖️ ক্যালিফোর্নিয়া সরকারের প্রতিক্রিয়া

🗣️ গভর্নর গ্যাভিন নিউসোম

ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসোম এই পদক্ষেপকে “বেপরোয়া” ও “আমাদের সৈন্যদের প্রতি অসম্মানজনক” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন:

“লস অ্যাঞ্জেলেসে ফেডারেল সেনা মোতায়েন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং এটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উস্কে দেয়ার মত কাজ।”

নিউসোম আরও জানিয়েছেন, ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য এই সেনা মোতায়েনের বিরুদ্ধে ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে

🏙️ মেয়র ও স্থানীয় প্রশাসন

লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র ক্যারেন ব্যাস (Karen Bass) ও এলএপিডি (LAPD) কর্মকর্তারাও এই সেনা মোতায়েনের সমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলেন, এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে এবং স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে বাধাগ্রস্ত করছে।

মেয়র ব্যাস বলেন:

“আমাদের শহরে বাইরের সামরিক শক্তি এনে স্থিতি নয়, বরং বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হচ্ছে।”


📚 ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

লস অ্যাঞ্জেলেসে শেষবার মার্কিন মেরিন মোতায়েন হয়েছিল ১৯৯২ সালে, যখন পুলিশ অফিসারদের রডনি কিংকে মারধরের ঘটনায় বেকসুর খালাস দেওয়া হয় এবং বিশাল দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় প্রায় ১০,০০০ ন্যাশনাল গার্ড ও সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল।

২০২৫ সালের মোতায়েনটি প্রথমবারের মত একটি রাজ্যপালের সম্মতি ছাড়াই সরাসরি প্রেসিডেন্টীয় আদেশে সম্পন্ন হলো, যা মার্কিন সংবিধান ও ফেডারেলিজম ব্যবস্থার উপর বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।


🎯 ট্রাম্পের অবস্থান

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে বলেন:

“আমি আমেরিকাকে সুরক্ষিত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা অভিবাসন আইন মানতে বাধ্য করবো এবং যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের থামানো হবে।”

ট্রাম্প আরও দাবি করেন যে “ক্যালিফোর্নিয়া প্রশাসন আইন প্রয়োগে ব্যর্থ” হওয়ায় তিনি এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন।


🧭 রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিভক্তি

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্বিমত সৃষ্টি হয়েছে। রিপাবলিকানরা এটিকে “শৃঙ্খলা ফেরানোর সাহসী পদক্ষেপ” বলে প্রশংসা করেছে, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা একে “কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার” বলেই মনে করছেন।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট নেতারা বলছেন:

“একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে সামরিকীকরণ করার এই উদাহরণ গভীরভাবে উদ্বেগজনক।”


🌎 জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য শহরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে

নিউ ইয়র্ক, ডেনভার, মিয়ামি, শিকাগো—এই শহরগুলোতেও একই ইস্যুতে বিক্ষোভ হচ্ছে। কিছু জায়গায় পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও সহিংসতা ঘটেছে।

🌐 আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রে সেনা মোতায়েন এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।


✅ উপসংহার: যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও ফেডারেল কাঠামোর সামনে চ্যালেঞ্জ

লস অ্যাঞ্জেলেসের চলমান পরিস্থিতি শুধু একটি শহরের শান্তি ভঙ্গ নয়, বরং এটি মার্কিন গণতন্ত্র ও ফেডারেল কাঠামোর গভীর এক সংকটের প্রতিচ্ছবি।

একদিকে অভিবাসন নিয়ে জনগণের ক্ষোভ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীয়ীকরণ—এই দুইয়ের সংঘাতে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতি এবং সামাজিক পরিবেশ কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যদি আপনার কোনও বিষয়ে ডাউট থাকে বা কোনও বিষয় suggest করতে চান তাহলে মেল করুন!

নবীনতর পূর্বতন

banglafacts 4