লস অ্যাঞ্জেলেসে ব্যাপক বিক্ষোভ ও অস্থিরতা: যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিকে ঘিরে উত্তাল জনজীবন
২০২৫ সালের ৬ জুন শুক্রবার থেকে শুরু হয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে এক নজিরবিহীন সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। ফেডারেল ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE)-এর পরিচালিত অভিবাসন ধরপাকড় অভিযানের প্রেক্ষিতে এই অস্থিরতা শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতীয় গার্ড বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্ত আরও বিতর্ক ও সংঘাতের জন্ম দেয়।
ঘটনার সূচনা: ICE-এর অভিযান
লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ফেডারেল সরকারের ব্যাপক ধরপাকড় অভিযানে উত্তেজনার শুরু। ICE-এর কর্মকর্তারা শহরের বিভিন্ন অংশে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১০০-এর বেশি অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করে। অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ছিল ফ্যাশন ডিস্ট্রিক্টের কাপড়ের পাইকারি বাজার, একটি হোম ডিপো পার্কিং লট ও অন্যান্য জনবহুল এলাকা। এই গ্রেপ্তারগুলিকে অনেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ থেকে সহিংসতায় রূপান্তর
প্রথমে প্রতিবাদকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে ফেডারেল বিল্ডিং ও মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে, যেখানে অনেক অভিবাসী আটক ছিলেন। কিন্তু খুব দ্রুত পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা বর্ডার পেট্রোলের যানবাহন আটকাতে গেলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়।
১০১ ফ্রিওয়ে অবরোধ
বিক্ষোভকারীরা লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক ১০১ ফ্রিওয়ে অবরোধ করে। তারা পাথর, ইলেকট্রিক স্কুটার, আতশবাজি এবং কংক্রিটের টুকরো নিক্ষেপ করে পুলিশের ওপর। এই ঘটনায় বহু যানবাহনের ক্ষতি হয়, এবং শহরজুড়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
জাতীয় গার্ড মোতায়েন ও বিতর্ক
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লস অ্যাঞ্জেলেসে “শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে” জাতীয় গার্ড মোতায়েনের নির্দেশ দেন। শত শত সেনা সদস্য শহরে নামানো হয় এবং ভবিষ্যতে আরও সেনা পাঠানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র ক্যারেন ব্যাস প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্তকে “অবৈধ” ও “অনৈতিক” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন।
সহিংসতা ও ধ্বংস
এই সংঘর্ষ ও অস্থিরতার ফলে শহরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা যায়:
- কমপক্ষে চারটি স্বচালিত গাড়ি (Waymo) পুড়িয়ে ফেলা হয়, যার ফলে আকাশে ঘন কালো ধোঁয়ার মেঘ দেখা যায়।
- বেশ কয়েকটি দোকানপাট লুটপাটের শিকার হয়েছে।
- এলএপিডি সদর দফতর, মার্কিন কোর্ট হাউজ ও পুরনো লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস ভবনের জানালার কাচ ভেঙে ফেলা হয় এবং দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা হয়।
- শহরের বিভিন্ন প্রান্তে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা।
পুলিশের প্রতিক্রিয়া
শহরজুড়ে পুলিশ এবং জাতীয় গার্ড সদস্যরা সংঘর্ষ মোকাবেলায় টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, পিপার বল এবং ফ্ল্যাশ ব্যাং ব্যবহার করে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে “অবৈধ জমায়েত” ঘোষণা করা হয়। তবুও আন্দোলন থামেনি, বরং রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংঘর্ষ আরও বৃদ্ধি পায়।
গ্রেপ্তার ও নেতৃত্বের ভূমিকা
এই সংঘর্ষে বহু আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন একজন বিশিষ্ট শ্রমিক সংগঠনের নেতা। তাকে পুলিশ বাধা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্দোলনকারীরা এই গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অংশ হিসেবে দেখছে।
রাজনৈতিক বিতর্ক ও দোষারোপ
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র দোষারোপের খেলা। মেয়র ব্যাস ও গভর্নর নিউজম অভিযোগ করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাতীয় গার্ড পাঠিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছেন এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংঘর্ষ সৃষ্টি করেছেন। অপরদিকে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল এই আন্দোলনকে "দাঙ্গা" বলে চিহ্নিত করেছেন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সেনা মোতায়েনকে ন্যায্য বলেই দাবি করেছেন।
পরিস্থিতির ভবিষ্যত
লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে এখনও প্রচুর পুলিশ ও সেনা মোতায়েন রয়েছে। বিভিন্ন এলাকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এবং জনসাধারণকে ঘরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলন থামার কোনো লক্ষণ নেই। সামাজিক মাধ্যমে #FreeLA ও #NoMoreRaids হ্যাশট্যাগে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের ক্ষোভ ও সমর্থন জানাচ্ছেন।
সমাপ্তি কথা
এই আন্দোলন ও সংঘর্ষ শুধু লস অ্যাঞ্জেলেসের সমস্যা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অভিবাসন নীতি, মানবাধিকার, এবং ফেডারেল বনাম রাজ্য সরকারের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের একটি প্রতিচ্ছবি। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এই আন্দোলনের ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
আপনার মতামত আমাদের জানান:
আপনি কি মনে করেন, জাতীয় গার্ড মোতায়েন করা উচিত ছিল? ICE-এর আচরণ কতটা মানবিক ছিল? আপনার মন্তব্য লিখুন নিচে।
সতর্কতা: এই প্রতিবেদন অব্যাহতভাবে আপডেট করা হবে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য আমাদের সাথেই থাকুন।
ট্যাগস: #লসঅ্যাঞ্জেলেস #ICE_Raids #NationalGuard #Trump #Protests2025 #ImmigrationCrisis #বাংলা_সংবাদ #যুক্তরাষ্ট্র #মানবাধিকার